এক সাদা সোনার সন্ধানে
গৌতম কুমার রায়
গৌতম কুমার রায়
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আয়ের উৎস চিংড়ি। চিংড়িকে ঘিরে জাতীয় আয়ের পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান এবং প্রসারতা লাভ করেছে মৎস্য শিল্পের। গলদা চিংড়ি দেশের প্রায় সর্বত্র চাষযোগ্য হওয়ায় দেশের মানুষের আমিষ খাদ্যের যোগান দিচ্ছে আর বাগদা চিংড়ি রপ্তানি পণ্যের তালিকায় স্থান করে নেয়ায় এই শিল্পের হিমায়িত খাদ্য হতে গত ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে দেশ আয় করেছে ৫১৫.৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা মোট রপ্তানি আয়ের ৪.২০ শতাংশ। অথচ হিমায়িত খাদ্যের এই রপ্তানি খাত শুধু মা বাগদা চিংড়ির দুষপ্রাপ্যতার কারণে হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের মোট ভূমির পরিমাণ ১.৪৪ কোটি হেক্টর। দেশে উর্বরা সমুদ্র এলাকা রয়েছে ৪৮০ কি.মি., তটরেখা ২০০ নটিক্যাল মাইল। যা কিনা এ দেশের মূল ভূ-খণ্ডের চেয়েও বড়। এর মধ্যে উপকূলীয় অর্থাৎ সমুদ্র সংযোগ স্থল ও ৫ পিপিটি লবণাত্মক এলাকা রয়েছে ১৭ শতাংশ। বিশাল সমুদ্র জলরাশিতে বাগদার মা-চিংড়ি আজ দুষপ্রাপ্য। যে জন্য আমরা প্রাকৃতিক পরিপক্ব চিংড়ি পোনার ব্যাপক চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছি। দেশে হ্যাচারীতে যে চিংড়ি পোনা উৎপন্ন হয় তা দিয়ে প্রকৃত চাহিদার শতকরা ৫ ভাগ পূরণ করা সম্ভব। অথচ অবশিষ্ট শতকরা ৯৫ ভাগ বাগদা চিংড়ির পোনার জন্য আমাদের নির্ভরতা প্রাকৃতিক চিংড়ির পোনার ওপর। যদিও প্রাকৃতিক পোনার যোগান ব্যবস্থা বেশ কষ্টসাধ্য। তারমধ্যে প্রাপ্য পোনার শতকরা ১৯ ভাগ পোনা বেঁচে থাকে সংগ্রহকালীন সময় পর্যন্ত। অর্থাৎ পোনা সংগ্রহ, পরিবহন এবং তা প্রতিপালনের পদ্ধতিগত অভাবের কারণেই অল্প সময় পর্যন্ত এই টিকে থাকা।
আমাদের দেশে কিছুদিন ধরেই চিংড়ির রেণু পোনার অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মা চিংড়ির দুষপ্রাপ্যতার জন্য দেশের ৫৩টি হ্যাচারীর মধ্যে ৪০টিতেই মা চিংড়ির উৎপাদিত বন্ধ। বিভিন্ন কারণে প্রকৃতিগতভাবে মা চিংড়ি এবং প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা অহরহ পাওয়া যাচ্ছে না। সাগরে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ট্রলিং এবং নির্বিচারে চিংড়ি পোনা ধরার ফলে মা চিংড়ির সংকটের তীব্রতা বাড়ছে। আশির দশকের কিছু পূর্ব হতে প্রাকৃতিক উৎস থেকে বাগদা চিংড়ির পোনা আহরণের প্রবণতা দেখা যায়। বছরে এখনও ২০০ কোটিরও বেশি বাগদা পোনা আহরণ করা হয়। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই চিংড়ি ধরতে গিয়ে ৯৯টি অন্যান্য চিংড়ি মাছ ও অন্যান্য জু-প্লাঙ্কটন মারা যায়। ফলে প্রতি বছর সাগরের অনেক চিংড়ি ও মাছ শুধু বেঁচে না থাকতে পেরে তারা যেমন বড় হতে পারছে না আবার বিপুল সংখ্যক চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ যা বড় হওয়ার আগেই তাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। এই পোনা সংগ্রহ করতে অধিকাংশ অপ্রশিক্ষিত নারী ও শিশুরা কাজ করে থাকে এবং এরা মৌসুমী জেলে হিসেবে এ পেশাকেও মৌসুমী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাগদা চিংড়ির অধিকতর উৎপাদনের জন্য এর পোনা পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করা জরুরি। তবে বাগদার মা চিংড়ি দুষপ্রাপ্যতার জন্য আরো কিছু বিষয়ে বাস্তব ভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কেননা মা চিংড়ি ব্যবস্থাপনার অন্তরায়গুলোকে চিহ্নিত করার এখনই সময়। যেমন- কক্সবাজার জেলার সেন্টমার্টিন সংলগ্ন এ্যালিফ্যান্ট পয়েন্ট ও খুলনা-সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন কোহিনুর পয়েন্টে যেভাবে অদক্ষ মৌসুমী জেলেরা অপরিকল্পিতভাবে নির্বিচারে চিংড়ির পোনা ধরে থাকে তা থেকে নিয়মিত মনিটরিং করে পদ্ধতিগত আহরণের অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। মা চিংড়ি ধরার জন্য অতিরিক্ত কিছু জাহাজকে ট্রলিং এর কাজে ব্যবহার করলে ভালো হয়।
টেকনাফ হতে শরণখোলা পর্যন্ত বিশাল উপকূলীয় এলাকাতে চিংড়ির পোনা ধরার সময় অন্যান্য বিভিন্ন প্রজাতির জলজ সম্পদ অপ্রয়োজন ভেবে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে তা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে অপ্রয়োজনীয় রেণু/ডিম যেন পানিতে ছেড়ে দেয়া হয় সে ব্যাপারে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া দরকার।
প্রতিটি ট্রলিং জাহাজগুলোর ম্যান পাওয়ার বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ঘটিয়ে কাজে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। ১৯৮৩ সালে প্রণীত আইন অনুযায়ী সাগরের ৪০ মিটার গভীরতার বাইরে মা চিংড়ি ধরার বিধান রয়েছে। অথচ সমুদ্রে বাগদা মা চিংড়ির বিচরণ ক্ষেত্র ৪০-৮০ মিটার গভীরতায়। ডিম পাড়ার সময় এরা ১৮-৪০ মিটার গভীর পানিতে চলে আসে। আবার সাগরের লবণাক্ততা কমে যাওয়ায় মা চিংড়ি স্থান পরিবর্তন করে এই গভীরতায় অর্থাৎ সাগর তীর অভিমুখে স্থান পরিবর্তন করছে। যেজন্য ফিসিং এ নিয়োজিত ট্রলারকে ২০-৩০ মিটার গভীরতার মধ্যে ট্রলিং করার অনুমতি দিলে মা চিংড়ি পাওয়া যেতে পারে।
প্রজনন মৌসুমে চিংড়ির বিচরণ এলাকায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যে কোন ট্রলিং বা চিংড়ির পোনা আহরণ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রাকৃতিক প্রজননের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। অর্থাৎ অভয় প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে দিলে সুস্থ সবল পোনা প্রাপ্যতা সম্ভব হবে।
শুধু সাগরের প্রাকৃতিক প্রজননের ওপর নির্ভর না করে হ্যাচারীতে অথবা পুকুর বা ঘেরে কিভাবে প্রজননক্ষম মা চিংড়ির ব্রীড ঘটানো যায় তার উপায় উদ্ভাবন করা খুবই জরুরি। একটি মা চিংড়ি সাগর স্থলে প্রাকৃতিক পরিবেশে ২-৮ লাখ পর্যন্ত ডিম ছেড়ে থাকে, আবার পুকুর বা ঘেরে ঐ চিংড়ি ০.৫-২ লাখ পর্যন্ত ডিম ছাড়তে সক্ষম। অর্থাৎ বিশেষ সুবিধা হলো, ঘেরের মা চিংড়ির মূল্য বেশ কম এবং তা সচরাচর সহজপ্রাপ্যও বটে।
বাগদা দেশের সাদা সোনা হিসেবে পরিচিত। একটু পদ্ধতিগত দিক বিবেচনা করে খুব সহজে অনেক বিদেশী অর্থ আয় করা সম্ভব এ খাত থেকে। কেননা ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে পর্যন্ত সময়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয় ১৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আবার ২০০৭-২০০৮ অর্থ বছরে ঐ সময়ে ১৫৪.৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আয় সম্ভব হয়েছিল ১৪১.৭৭ মি. মার্কিন ডলার। এত অল্প সময়ে অনেক রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য মা চিংড়ির উৎপাদন সহজলভ্যতা এবং তা থেকে পদ্ধতিগতভাবে প্রজননের মাধ্যমে চিংড়ি পোনা উৎপাদন করলে এ খাতে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাম্পার ফলন ফলান সম্ভব হবে। পরিবেশগত পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের জলজ সম্পদে বিশেষ করে মা বাগদা চিংড়ির বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে আমাদের বিশাল সামুদ্রিক জলরাশির প্রতিটি ফোঁটাকে সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: ফার্মহাউস

1 comment:
New casino in las vegas - DRMCD
There's a casino 경기도 출장안마 called Casino.lv. There's also a bar and 파주 출장마사지 nightclub called Casino.lv. It's open 안산 출장샵 24 hours a 충주 출장마사지 day, 4am-7am. The casino, 의정부 출장안마 which is owned and operated by the
Post a Comment