হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের বীজ সম্পদ

গাছের যে অংশ বংশ বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয় অর্থাৎ যা দিয়ে পরবর্তী বছরে চাষাবাদের মধ্যদিয়ে ফসল উৎপাদন করা হয় এবং ভবিষ্যত উৎপাদনের জন্য সংরন করা হয় সাধারন অর্থে তাকেই বীজ বলা হয়। আমাদের কৃষি নির্ভর সভ্যতার মূল ভিত্তিই হলো বীজ। কৃষি কাজের জন্য বীজ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ন এবং অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ।

বীজ উৎপাদনে কৃষকদের ভূমিকা, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যঃ

যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশের কৃষকগন তাদের প্রয়োজনীয় বীজ নিজেরাই উৎপাদন করতেন এবং পারষ্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে তারা প্রয়োজন মেটাতেন। একটি এলাকার ভাল গুনাগুন সম্পন্ন ফসলের জাতের বীজ অন্য এলাকার কৃষকগন এরূপ বিনিময়ের মাধ্যমেই সংগ্রহ করতেন। বাছাই ও নির্বাচনের মাধ্যমে কৃষকগন ভাল জাতের বীজ সংরন করতেন এবং খারাপ জাতের বীজ নিজেরাই বাদ দিয়ে দিতেন। এভাবে পুরো বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়াতে কৃষকগন ছিলেন স্বয়ংসম্পুর্ন এবং বীজের উপর তাদের নিরঙ্কুশ অধিকার ও নিয়ন্ত্রন ছিল। বীজের জন্য কৃষকের বাজারের উপর নির্ভরশীলতা ছিলনা বললেই চলে। তা ছাড়া গ্রাম বাংলার কৃষকগন তাদের উদ্ভাবনী শক্তি ও লোকজ জ্ঞান ব্যবহার করে স্থানীয় প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী বীজ নির্বাচন করত। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকায়িত ছিল বন্যা, খরা, লবনাক্ততা, জলোচ্ছাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার কৌশল। এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ায় যুগ যুগ ধরে টিকে ছিল প্রান বৈচিত্র্যের সমাহার, টিকে ছিল একেক ফসলের শত শত রকমের জাত। বাংলাদেশ প্রানবৈচিত্র্যের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম দেশ হওয়ার চাবিকাঠিও ছিল বীজ উৎপাদন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কৃষকদের নিয়ন্ত্রন।

উফশী এবং হাইব্রীড বীজের প্রবর্তন এবং আমাদের জেনেটিক রিসোর্সঃ

ষাটের দশকে তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে উচ্চ ফলন শীল (উফশী) জাতের বীজের প্রবর্তনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় বীজের উপর কৃষকের অধিকার ও নিয়ন্ত্রন হারানোর প্রক্রিয়া। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে বাংলাদেশে হাইব্রিড বীজের প্রবর্তন এ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। হারিয়ে যেতে থাকে আমাদের অমূল্য সম্পদ হাজার রকমের দেশীয় ফসলের জাত। ১৯৭৪ সালের এক সমীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশে ৭৪৩৯ টি ধানের জাত সনাক্ত করা হয়েছে। (সূত্রঃ বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ)। বর্তমানে অধিকাংশ জাতই হারিয়ে গেছে, অনেকের মতে বর্তমানে তা ২০০ টির নীচে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় শাকসব্জী সমূহের অধিকাংশ জাত হারিয়ে গেছে বা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে উফশী বা হাইব্রীড জাত যার উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের নিয়ন্ত্রন করছে বহুজাতিক কোম্পানী সহ দেশী বিদেশী বড় বড় কোম্পানী সমূহ। এর ফলে আমাদের দেশের কৃষকগণ বীজের উপর অধিকার এবং নিয়ন্ত্রন ক্রমশই হারিয়ে ফেলছে।

পরিপ্রেক্ষিত, নোয়াখালীঃ

বিস্তীর্ন চরাঞ্চলের সমন্বয়ে গঠিত নোয়াখালী অঞ্চলের শতকরা আশিভাগেরও বেশী লোকের জীবিকার প্রধান বা একমাত্র অবলম্বন হলো কৃষি। কিন্তু বীজ সহ সকল কৃষি উপকরণ এর উপর কৃষকগণের কোন নিয়ন্ত্রন না থাকায় এবং উচ্চমূল্যের কারণে তারা আর্থিকভাবে তিগ্রস্থ হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির ধান সহ নানান শাকসব্জীর বীজ। ফুলমতি, লাঠিয়াল, চুয়াই, ভুঁষিহারা, কটকতারা, মইলাম, মতিহরি, আগুনিশাইল, লোহামুরা, বাঁশমতি, ফুলবাদাম ইত্যাদি অনেক জাতের ধানের নাম অনেক প্রবীন কৃষকের মুখে শোনা গেলে ও এগুলো এখন আর এ অঞ্চলে পাওয়া যায় না। হারিয়ে যেতে বসেছে ষাইটা, ঘিগজ, শাক্করখোরা, কালিজিরা, কালা মোডা, ধলা মোডা, বাজাল ইত্যাদি অনেক জাতের ধান। ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে কালো রঙের দেশী তরমুজ, দেশীয় জাতের মূলা, টমাটো সহ অনেক সব্জীর জাত। বন্ধ হয়ে গেছে কাউন, তিল, তিসি, মুগ ইত্যাদি জাতের ফসল আবাদ। হারিয়ে যাওয়া এসকল ফসলের জাত সমূহের ছিল বন্যা খরা রোগ ইত্যাদি প্রতিরোধের প্রাকৃতিক মতা। জীব বৈচিত্র্য বজায় রাখা, ভূমির উর্বরতা বজায় রাখার জন্য এসকল জাতের ভুমিকা ছিল অপরিসীম। অথচ আধুনিক কৃষির ডামাডোলে, মুনাফালোভী বহুজাতিক কোম্পানী কর্তৃক উফশী এবং হাইব্রীড জাতের বীজের ব্যবসার কারণে আমরা আমাদের অতি মূল্যবান জেনেটিক সম্পদ সমূহ হারিয়ে যেতে বসেছে। অতি মূল্যবান এ সকল জেনেটিক সম্পদ রার জন্য এক্ষুনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অবশিষ্ট সম্পদ সমূহও অচিরেই হারিয়ে যাবে এবং জাতির জন্য যে অপূরনীয় তি হবে তা আর কখনো পুনরুদ্ধার করার উপায় থাকবেনা। অথচ সরকারিভাবে এ সকল জেনেটিক রিসোর্স সমূহ রা করার জন্য কোন উদ্যোগ এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি। উপযুক্ত গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করে স্থানীয় জেনেটিক রিসোর্সসমূহ সংরক্ষণের এবং এগুলো ব্যবহার করে আমাদের জল হাওয়ার উপযোগী জাত উদ্ভাবনে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীগণের জন্য সুযোগ তৈরী করে দিলে একদিকে যেমন জেনেটিক সম্পদসমূহ রক্ষা পেত অপরদিকে বেচে যেত বীজ আমদানীর জন্য কোটি কোটি টাকা। অথচ আমরা তা না করে বহুজাতিক কোম্পানী সমূহের জন্য বীজ ব্যবসার সুযোগ তৈরী করে দিচ্ছি। ফলে জেনেটিক রিসোর্স হারানোর পাশাপাশি আমাদের কৃষক এমনকি পুরো কৃষি ব্যবস্থাকেই বহুজাতিক কোম্পানী সমূহের কাছে জিম্মি করে ফেলেছি।

এ অবস্থার হাতে থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য যেমন প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, তেমনি প্রয়োজন আমাদের জনসচেতনতা। আমরা গ্রাম পর্যায়ে কৃষকগণকে সংগঠিত করে গ্রাম পর্যায়ে ছোট ছোট বীজ ভান্ডার গড়ে তুলতে পারি। সেখানে কৃষকগণ দেশীয় কিন্তু কার্যকরী পদ্ধতি ব্যবহার করে বীজ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করবে এবং নিজেদের প্রয়োজন মত তা ব্যবহার করতে পারবে। এতে করে স্থানীয় জেনেটিক রিসোর্স সমুহকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রা পাবে। স্থানীয় কৃষকগণ নিজেদের বীজ নিজেরা উৎপাদনে উৎসাহিত হবে এবং বাজারের উপর নির্ভরশীলতা কমবে। সর্বোপরি বীজ সম্পদের উপর কৃষকগণের অধিকার নিশ্চিত হবে।

  • সহকর্মী কৃষিবিদ তপন চক্রবর্ত্তীর লেখা। লেখকের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত।
তথ্যসূত্র: মুকুলবিডি

No comments: