চলতি সময়ে কৃষিতে করণীয়
কৃষিবিদ মো. রেজাউল হক
কৃষিবিদ মো. রেজাউল হক
পোল্ট্রি
শীতকাল চলছে। শীতে মোরগ-মুরগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া স্বাভাবিক| কাজেই পোলট্রির বিভিন্ন রোগ যেমন-রানীক্ষেত, ইনফেকশাস, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব এ মাসেও দেখা দিতে পারে।
১. শীতের শেষে মোরগ-মুরগীর অপুষ্টিজনিত সমস্যা যেমন ভিটামিন এ, সি, ডি, ই, কে, বি ও ফলিক এসিড এসবের বিশেষ করে ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই এর অভাব দেখা যায় যার ফলে পোলট্রির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।
২. এ সময় মাঝে মাঝে বাতাস বইতে পারে। বাতাসে লিটারের এমোনিয়া গ্যাস, রোগ-জীবাণু, বিরক্তিকর গন্ধ, ধুলা-বালি এসব মোরগ-মুরগীর পরিবেশের ক্ষতি করে থাকে। লিটার সংক্রান্ত সমস্যার কারণে মুরগির গায়ের পালক ময়লাযুক্ত হয়। ঘরে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ এবং মাছির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
৩. এ সময়ের হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি মোরগ-মুরগীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। মোরগ-মুরগী প্রতিকুল তাপমাত্রায় খাপ খাওয়াতে পারে না, খাদ্য গ্রহণের চাহিদা কমে যায়।
পোল্ট্রি ব্যবস্থাপনায় এ সময়ের করনীয়
১. অপুষ্টিজনিত রোগ, চিকিৎসা ও ভিটামিন এর অভাবে মুরগীর ডিম পাড়ার হার কমে যায়। ডিমের গায়ে রক্তের ফোঁটা দাগ দেখা যায়। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব প্রকট হলে চোখের পাতা এবং চোখের ঝিল্লি শুকিয়ে আসে, হাঁটু ও চামড়ার হলুদ রঙ নষ্ট হতে শুরু করে এবং ঝুঁটি শুকনো ও ফ্যাকাসে দেখাবে। এ সমস্যার প্রতিকার হিসেবে খাদ্যে ভিটামিন-এর নিয়মিত সংমিশ্রণ করার সময় এন্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবহার করতে হবে।
২. ভিটামিন ‘ডি’র অভাবে বাড়ন্ত মুরগির রিকেট্স বা হাড় বাঁকা হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়। তাছাড়া মোরগ-মুরগীর ঠোঁট, পায়ের নখ এবং হাড়গুলো নরম হয়ে আসে। অসুস্থ মুরগি হাঁটতে চায় না এবং পায়ের উপর বসে পড়ে। এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে খামারের মুরগির খাবারে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভিটামিন ডি-৩ সংমিশ্রণ করা দরকার। ভিটামিন ‘ই’ পোলট্রির আরেকটি প্রয়োজনীয় উপাদান। এর অভাবে মস্তক নরম হওয়া, মাংসের অপুষ্টি এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়। এ সমস্যা সমাধানকল্পে খাবারের সাথে ভিটামিন ‘ই’ প্রিমিক্স দেয়া যেতে পারে।
৩. দেশের কোথাও কোথাও বার্ড ফ্লু’র আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এটি ভাইরাসজনিত মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। এ রোগ দমনের জন্য বায়ো সিকিউরিটি বা জীব নিরাপত্তা ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করা একান্ত জরুরী। এগুলো নিম্নরূপ :
৪. খামারের ভিতরে এবং বাইরে সকল প্রকারের যানবাহন ও দর্শনার্থীদের চলাচল হ্রাস করতে হবে।
৫. সকল যানবাহন এবং সরঞ্জামাদি খামারে প্রবেশের পূর্বে এবং খামার পরিত্যাগকালে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
৬. খামারে প্রবেশের পূর্বে ও প্রস্থানকালে গোসল করার আইন প্রবর্তন করতে হবে এবং এজন্য প্রবেশ পথে গোসলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
৭. খামারের সকল প্রবেশ পথে এবং প্রতি মুরগির ঘর/খাদ্য ভান্ডারের দরজার সামনে জীবাণুনাশকের সলিউশন ন্যূনপক্ষে প্রতি ৪ দিন অন্তর অথবা বেশি নোংরা হয়ে গেলে তা আগেই পরিবর্তন করতে হবে।
৮. মুরগির ঘর/খাদ্য ভান্ডার থেকে বন্য পাখি বিতাড়িত করতে হবে এবং বানিজ্যিক মুরগির সাথে তাদের সাহচর্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
.
৯. খাদ্যের পাত্রের নীচে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট সকল খাদ্য পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। যাতে সেখানে বন্য পাখি এবং ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর আগমন না ঘটে।
১০. বাণিজ্যিক মুরগিকে পানীয় জল সরবরাহের জন্য কখনও দাঁড়ানো (Standing) পানি কিংবা জলাশয়ের পানি ব্যবহার করা যাবে না কারণ তা বন্য পাখির বিষ্ঠা দ্বারা দূষিত থাকতে পারে।
গবাদিপশু
আমাদের দেশের অধিকাংশ কৃষক এখনো শুধু হালচাষের জন্যই ২-৩টি গরুপালন করে থাকেন। তবে বানিজ্যিকভাবে ডেইরি ফার্মও গড়ে উঠেছে ইদানীংকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে। ক্ষুদ্র খামারি, বিত্তহীন/ভূমিহীন চাষি কর্তৃক ছাগল-ভেড়া প্রতিপালন ইদানীংকালে বেশ লক্ষণীয়। খাদ্য চাহিদা তুলনামুলকভাবে কম এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পারিবারিক আয়ের অন্যতম উৎস হওয়ায় ছাগল-ভেড়াকে বলা হয় গরিবের গাভী”। মাংস ও চামড়া উৎপাদনে এদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ছাগল-ভেড়া কোথা হতে সংগ্রহ করবেন?
সরকারি-বেসরকারি প্রজনন খামার থেকে ভালো জাতের ছাগল-ভেড়া সংগ্রহ করা ভালো। তা না হলে নিজস্ব গ্রাম বা পার্শ্ববর্তী গ্রামের পরিচিত লোকের কাছ থেকে ক্রয় করা যেতে পারে। ছাগল-ভেড়া সংগ্রহের সময় সেটি অধিক উৎপাদনশীল বংশের কি না, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন কি না কিংবা অন্যান্য গুণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যাদি জেনে সংগ্রহ করতে হবে।
কোথায় রাখবেন
ক্ষুদ্র খামারি বা পারিবারিক পর্যায়ে ছাগল-ভেড়া পালনের জন্য ছাগল-ভেড়ার ঘরবাড়ি ভেতর বা বাইরে তৈরি করা যেতে পারে। আলাদা ঘর তৈরির সামর্থ্য না থাকলে গোয়াল ঘরে গরুর সাথে ছাগল-ভেড়া রাখতে পারেন। তবে ছাগল-ভেড়াকে আলাদা রাখাই ভাল। এক্ষেত্রে বাঁশের চাটাই ঘেরা এবং চাল টিন দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। টিন দিয়ে সম্ভব না হলে খড়, শন, চাটাই এর উপর পলিথিন দিয়ে সিলিং তৈরি করা যেতে পারে। বসতবাড়ির বারান্দায় মাটির খোঁয়ার তৈরি করেও ছাগল-ভেড়ার রাতের আবাসস্থল বানানো যেতে পারে। বানিজ্যিকভাবে ছাগল-ভেড়া পালনের জন্য এদের ঘর ইট বা বাঁশের তৈরি হতে হবে। ঘরে মাচা থাকা উত্তম।
মৎস্য
মৎস্য চাষিভাইদের এ সময়ের করণীয় কাজগুলো নিম্নরূপ :
১. এ সময়ে পুকুরে পানি থাকে কম। কাজেই পুকুর শুকানো ও অন্যান্য সংস্কারের কাজগুলো এ সময়ে খুব সহজে ও কম খরচে করা যেতে পারে। পুকুর শুকিয়ে রাক্ষুসে মাছ তুলে ফেলুন। পুকুর শুকানোর আরেকটি উপকারও রয়েছে, তা হচ্ছে তলার দূষিত গ্যাস দূর করা যায়।
২. পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নিন। সারের ব্যবহার আবারো শুরু করুন। সার প্রয়োগ করলে তা মাছ খায় এ ধারণা ঠিক নয়। সার প্রয়োগে পুকুরে খাদ্য চেইন তৈরি হয় অর্থাৎ পানিতে বিরাজমান ক্ষুদ্র উদ্ভিদ কণা, ক্ষুদ্র প্রাণীজ কণা এবং পুকুরের তলদেশে অবস্থিত বিভিন্ন প্রকার জীব প্রতিপালিত হয়। এগুলোই মূলত মাছের খাদ্যের প্রয়োজনীয় উপাদান। পুকুরে খাদ্য মালা (ফুড চেইন) তৈরির জন্য জৈব ও রাসায়নিক উভয় সারই প্রয়োগ করা দরকার।
৩. এ সময় মাছের ক্ষতরোগসহ বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দিতে পারে। রোগাক্রান্ত পুকুরে শতাংশপ্রতি ১ কেজি হারে পাথুরে চুন ছিটানো যেতে পারে। এছাড়া প্রয়োজনবোধে নিকটস্থ জেলা/উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সহায়তা নেয়া যেতে পারে।
ফসল
ধান
উফ্শী বোরো ধানের এ সময় সঠিক পরিচর্যা করা দরকার। ভালো ফলন পেতে হলে সময়মতো সারের উপরি প্রয়োগ, আগাছা দমন, পানি সেচ এসব কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে হবে। চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর হেক্টর প্রতি ৮০-৯০ কেজি (বিঘা প্রতি ১০-১২ কেজি) ইউরিয়া সার জমিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। আগাছা পরিষ্কার ও সার প্রয়োগ এক সঙ্গে করা ভালো। সার প্রয়োগের সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকতে হবে।
গম
এ মাসের দ্বিতীয়ার্ধে গম পাকা শুরু হয়। ভালো ফলন পেতে হলে সময়মতো গম কাটা দরকার। দানাগুলো পেকে পুরোপুরি হলদে গাছ যখন বেঁকে যায় এবং গমের দানা মুখে নিয়ে দাঁত দিয়ে কাটলে যদি কট্কট্ শব্দ হয় তাহলে বোঝা যাবে যে, কম কাটার সময় হয়েছে। সকালের দিকে গম কেটে ভালোভাবে মাড়াই-ঝাড়াই করার পর ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে ঘরে তুলতে হবে। এছাড়া বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হলে ভালোভাবে বীজ শুকিয়ে ঠান্ডা করে পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। মাটির পাত্র, টিনের পাত্র, ড্রাম কিংবা মোটা পলিথিনের ব্যাগে বীজ সংরক্ষণ করা যায়।
আলু
ইতোমধ্যে আলু সংগ্রহ শুরু হয়ে গেছে। আলু বীজ তোলার কয়েকদিন আগে মাটির উপরের গাছ কেটে দিন যাতে আলুগুলো মাটিতে থেকে পোক্ত হয়। পোকা ও রোগমুক্ত আলুক্ষেত হতে আলু বীজ সংগ্রহ করুন। বীজ আলু হিমাগারে রাখা উত্তম।
অন্যান্য করণীয়
আমের হপার বা ফুতকি পোকা মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা। এরা আম গাছের মুকুলের রস চুষে খাওয়ার ফলে ফুল কালো হয়ে ঝরে পড়ে। ম্যালাথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ওষুধ প্রতি লিটার পানিতে ২ মি.লি. হারে মিশিয়ে গাছে সেপ্র করলে মুকুল ঝরা বন্ধ হবে। জংলী কুল গাছকে উন্নত মিষ্টি কুল গাছে পরিণত করতে হলে স্থানীয় কৃষি সমপ্রসারণ কর্মীর সহায়তায় কুল গাছ ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থা নিন।
তথ্যসূত্র: ফার্মহাউস

No comments:
Post a Comment