আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বোরো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে: সি এস করিম

ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ০৯ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম)- কৃষি উপদেষ্টা সি এস করিম বলেছেন, বোরো ধান উৎপাদন বাড়াতে সরকার সার, বীজ ও ডিজেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।

শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত এক সংলাপে তিনি বলেন, "এবার বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা নিয়মিত তদারকি করছেন। তবে আমরা অনেকটাই প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি অনুকূলে থাকলে এবার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।''

চলতি বছর ৪৫ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক কোটি ৭৫ লাখ টন। গতবার লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় এক কোটি ৫০ লাখ টন।

সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহানের সভাপতিত্বে সংলাপে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন খাদ্য উপদেষ্টা শওকত আলী, সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, বিআইডিএস এর মহাপরিচালক কাজী সাহাবুদ্দিন, গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক সাংসদ আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ।

মূল প্রবন্ধ পড়েন সিপিডির গবেষণা বিভাগের প্রধান উত্তম দেব।

সি এস করিম বলেন, প্লাস্টিক, মেলামাইন, প্রিন্টিংসহ বিভিন্ন শিল্পে এখন ইউরিয়া সারের ব্যবহার হচ্ছে। কৃষির জন্য নির্ধারিত সারের ভর্তুকি যাতে এ সব খাতে না যায় সেটি তদারকি করছে সরকার।

খাদ্য উপদেষ্টা শওকত আলী বলেন, "কৃষি ঋণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। গত বছর কৃষি ঋণ বিতরণ সন্তোষজনক ছিল না। এবার বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ বিতরণের বিষয়টি তদারকি করছে।"

সরকার বোরো উৎপাদনের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বলে সংলাপে দাবি করেন মতিয়া চৌধুরী।

তিনি বলেন, "আমি এর বিপক্ষে নই। কিন্তু এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে কি-না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।"

সার বিতরণে সরকারের অদক্ষতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, "জরুরি অবস্থার মধ্যেও কৃষকরা সারের জন্য বিক্ষোভ করেছে। এর মানে, সার বিতরণের ক্ষেত্রে সরকারের দক্ষতা ও যোগ্যতার অভাব ছিল। শুধু লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করলে চলবে না। সেটি বাস্তবায়নের জন্য উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।"

চলতি সময়ে কৃষিতে করণীয়

চলতি সময়ে কৃষিতে করণীয়
কৃষিবিদ মো. রেজাউল হক



পোল্ট্রি

শীতকাল চলছে। শীতে মোরগ-মুরগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া স্বাভাবিক| কাজেই পোলট্রির বিভিন্ন রোগ যেমন-রানীক্ষেত, ইনফেকশাস, মাইকোপ্লাজমোসিস, ফাউল টাইফয়েড, পেটে পানি জমা এসব এ মাসেও দেখা দিতে পারে।



১. শীতের শেষে মোরগ-মুরগীর অপুষ্টিজনিত সমস্যা যেমন ভিটামিন এ, সি, ডি, ই, কে, বি ও ফলিক এসিড এসবের বিশেষ করে ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই এর অভাব দেখা যায় যার ফলে পোলট্রির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।



২. এ সময় মাঝে মাঝে বাতাস বইতে পারে। বাতাসে লিটারের এমোনিয়া গ্যাস, রোগ-জীবাণু, বিরক্তিকর গন্ধ, ধুলা-বালি এসব মোরগ-মুরগীর পরিবেশের ক্ষতি করে থাকে। লিটার সংক্রান্ত সমস্যার কারণে মুরগির গায়ের পালক ময়লাযুক্ত হয়। ঘরে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ এবং মাছির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।



৩. এ সময়ের হঠাৎ তাপমাত্রা বৃদ্ধি মোরগ-মুরগীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। মোরগ-মুরগী প্রতিকুল তাপমাত্রায় খাপ খাওয়াতে পারে না, খাদ্য গ্রহণের চাহিদা কমে যায়।



পোল্ট্রি ব্যবস্থাপনায় এ সময়ের করনীয়

১. অপুষ্টিজনিত রোগ, চিকিৎসা ও ভিটামিন এর অভাবে মুরগীর ডিম পাড়ার হার কমে যায়। ডিমের গায়ে রক্তের ফোঁটা দাগ দেখা যায়। ভিটামিন ‘এ’ এর অভাব প্রকট হলে চোখের পাতা এবং চোখের ঝিল্লি শুকিয়ে আসে, হাঁটু ও চামড়ার হলুদ রঙ নষ্ট হতে শুরু করে এবং ঝুঁটি শুকনো ও ফ্যাকাসে দেখাবে। এ সমস্যার প্রতিকার হিসেবে খাদ্যে ভিটামিন-এর নিয়মিত সংমিশ্রণ করার সময় এন্টিঅক্সিডেন্ট ব্যবহার করতে হবে।



২. ভিটামিন ‘ডি’র অভাবে বাড়ন্ত মুরগির রিকেট্‌স বা হাড় বাঁকা হওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়। তাছাড়া মোরগ-মুরগীর ঠোঁট, পায়ের নখ এবং হাড়গুলো নরম হয়ে আসে। অসুস্থ মুরগি হাঁটতে চায় না এবং পায়ের উপর বসে পড়ে। এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে খামারের মুরগির খাবারে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ভিটামিন ডি-৩ সংমিশ্রণ করা দরকার। ভিটামিন ‘ই’ পোলট্রির আরেকটি প্রয়োজনীয় উপাদান। এর অভাবে মস্তক নরম হওয়া, মাংসের অপুষ্টি এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পায়। এ সমস্যা সমাধানকল্পে খাবারের সাথে ভিটামিন ‘ই’ প্রিমিক্স দেয়া যেতে পারে।



৩. দেশের কোথাও কোথাও বার্ড ফ্লু’র আক্রমণ দেখা যাচ্ছে। এটি ভাইরাসজনিত মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। এ রোগ দমনের জন্য বায়ো সিকিউরিটি বা জীব নিরাপত্তা ব্যবস্থাবলী গ্রহণ করা একান্ত জরুরী। এগুলো নিম্নরূপ :



৪. খামারের ভিতরে এবং বাইরে সকল প্রকারের যানবাহন ও দর্শনার্থীদের চলাচল হ্রাস করতে হবে।



৫. সকল যানবাহন এবং সরঞ্জামাদি খামারে প্রবেশের পূর্বে এবং খামার পরিত্যাগকালে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে।



৬. খামারে প্রবেশের পূর্বে ও প্রস্থানকালে গোসল করার আইন প্রবর্তন করতে হবে এবং এজন্য প্রবেশ পথে গোসলের ব্যবস্থা রাখতে হবে।



৭. খামারের সকল প্রবেশ পথে এবং প্রতি মুরগির ঘর/খাদ্য ভান্ডারের দরজার সামনে জীবাণুনাশকের সলিউশন ন্যূনপক্ষে প্রতি ৪ দিন অন্তর অথবা বেশি নোংরা হয়ে গেলে তা আগেই পরিবর্তন করতে হবে।



৮. মুরগির ঘর/খাদ্য ভান্ডার থেকে বন্য পাখি বিতাড়িত করতে হবে এবং বানিজ্যিক মুরগির সাথে তাদের সাহচর্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

.

৯. খাদ্যের পাত্রের নীচে পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট সকল খাদ্য পরিষ্কার করে ফেলতে হবে। যাতে সেখানে বন্য পাখি এবং ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর আগমন না ঘটে।



১০. বাণিজ্যিক মুরগিকে পানীয় জল সরবরাহের জন্য কখনও দাঁড়ানো (Standing) পানি কিংবা জলাশয়ের পানি ব্যবহার করা যাবে না কারণ তা বন্য পাখির বিষ্ঠা দ্বারা দূষিত থাকতে পারে।



গবাদিপশু

আমাদের দেশের অধিকাংশ কৃষক এখনো শুধু হালচাষের জন্যই ২-৩টি গরুপালন করে থাকেন। তবে বানিজ্যিকভাবে ডেইরি ফার্মও গড়ে উঠেছে ইদানীংকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে। ক্ষুদ্র খামারি, বিত্তহীন/ভূমিহীন চাষি কর্তৃক ছাগল-ভেড়া প্রতিপালন ইদানীংকালে বেশ লক্ষণীয়। খাদ্য চাহিদা তুলনামুলকভাবে কম এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পারিবারিক আয়ের অন্যতম উৎস হওয়ায় ছাগল-ভেড়াকে বলা হয় গরিবের গাভী”। মাংস ও চামড়া উৎপাদনে এদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।



ছাগল-ভেড়া কোথা হতে সংগ্রহ করবেন?

সরকারি-বেসরকারি প্রজনন খামার থেকে ভালো জাতের ছাগল-ভেড়া সংগ্রহ করা ভালো। তা না হলে নিজস্ব গ্রাম বা পার্শ্ববর্তী গ্রামের পরিচিত লোকের কাছ থেকে ক্রয় করা যেতে পারে। ছাগল-ভেড়া সংগ্রহের সময় সেটি অধিক উৎপাদনশীল বংশের কি না, রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন কি না কিংবা অন্যান্য গুণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যাদি জেনে সংগ্রহ করতে হবে।



কোথায় রাখবেন

ক্ষুদ্র খামারি বা পারিবারিক পর্যায়ে ছাগল-ভেড়া পালনের জন্য ছাগল-ভেড়ার ঘরবাড়ি ভেতর বা বাইরে তৈরি করা যেতে পারে। আলাদা ঘর তৈরির সামর্থ্য না থাকলে গোয়াল ঘরে গরুর সাথে ছাগল-ভেড়া রাখতে পারেন। তবে ছাগল-ভেড়াকে আলাদা রাখাই ভাল। এক্ষেত্রে বাঁশের চাটাই ঘেরা এবং চাল টিন দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে। টিন দিয়ে সম্ভব না হলে খড়, শন, চাটাই এর উপর পলিথিন দিয়ে সিলিং তৈরি করা যেতে পারে। বসতবাড়ির বারান্দায় মাটির খোঁয়ার তৈরি করেও ছাগল-ভেড়ার রাতের আবাসস্থল বানানো যেতে পারে। বানিজ্যিকভাবে ছাগল-ভেড়া পালনের জন্য এদের ঘর ইট বা বাঁশের তৈরি হতে হবে। ঘরে মাচা থাকা উত্তম।



মৎস্য

মৎস্য চাষিভাইদের এ সময়ের করণীয় কাজগুলো নিম্নরূপ :



১. এ সময়ে পুকুরে পানি থাকে কম। কাজেই পুকুর শুকানো ও অন্যান্য সংস্কারের কাজগুলো এ সময়ে খুব সহজে ও কম খরচে করা যেতে পারে। পুকুর শুকিয়ে রাক্ষুসে মাছ তুলে ফেলুন। পুকুর শুকানোর আরেকটি উপকারও রয়েছে, তা হচ্ছে তলার দূষিত গ্যাস দূর করা যায়।



২. পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে নিন। সারের ব্যবহার আবারো শুরু করুন। সার প্রয়োগ করলে তা মাছ খায় এ ধারণা ঠিক নয়। সার প্রয়োগে পুকুরে খাদ্য চেইন তৈরি হয় অর্থাৎ পানিতে বিরাজমান ক্ষুদ্র উদ্ভিদ কণা, ক্ষুদ্র প্রাণীজ কণা এবং পুকুরের তলদেশে অবস্থিত বিভিন্ন প্রকার জীব প্রতিপালিত হয়। এগুলোই মূলত মাছের খাদ্যের প্রয়োজনীয় উপাদান। পুকুরে খাদ্য মালা (ফুড চেইন) তৈরির জন্য জৈব ও রাসায়নিক উভয় সারই প্রয়োগ করা দরকার।



৩. এ সময় মাছের ক্ষতরোগসহ বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দিতে পারে। রোগাক্রান্ত পুকুরে শতাংশপ্রতি ১ কেজি হারে পাথুরে চুন ছিটানো যেতে পারে। এছাড়া প্রয়োজনবোধে নিকটস্থ জেলা/উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সহায়তা নেয়া যেতে পারে।



ফসল

ধান

উফ্‌শী বোরো ধানের এ সময় সঠিক পরিচর্যা করা দরকার। ভালো ফলন পেতে হলে সময়মতো সারের উপরি প্রয়োগ, আগাছা দমন, পানি সেচ এসব কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন করতে হবে। চারা রোপণের ১৫-২০ দিন পর হেক্টর প্রতি ৮০-৯০ কেজি (বিঘা প্রতি ১০-১২ কেজি) ইউরিয়া সার জমিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। আগাছা পরিষ্কার ও সার প্রয়োগ এক সঙ্গে করা ভালো। সার প্রয়োগের সময় জমিতে ছিপছিপে পানি থাকতে হবে।



গম

এ মাসের দ্বিতীয়ার্ধে গম পাকা শুরু হয়। ভালো ফলন পেতে হলে সময়মতো গম কাটা দরকার। দানাগুলো পেকে পুরোপুরি হলদে গাছ যখন বেঁকে যায় এবং গমের দানা মুখে নিয়ে দাঁত দিয়ে কাটলে যদি কট্‌কট্‌ শব্দ হয় তাহলে বোঝা যাবে যে, কম কাটার সময় হয়েছে। সকালের দিকে গম কেটে ভালোভাবে মাড়াই-ঝাড়াই করার পর ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে ঘরে তুলতে হবে। এছাড়া বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হলে ভালোভাবে বীজ শুকিয়ে ঠান্ডা করে পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে। মাটির পাত্র, টিনের পাত্র, ড্রাম কিংবা মোটা পলিথিনের ব্যাগে বীজ সংরক্ষণ করা যায়।



আলু

ইতোমধ্যে আলু সংগ্রহ শুরু হয়ে গেছে। আলু বীজ তোলার কয়েকদিন আগে মাটির উপরের গাছ কেটে দিন যাতে আলুগুলো মাটিতে থেকে পোক্ত হয়। পোকা ও রোগমুক্ত আলুক্ষেত হতে আলু বীজ সংগ্রহ করুন। বীজ আলু হিমাগারে রাখা উত্তম।



অন্যান্য করণীয়

আমের হপার বা ফুতকি পোকা মারাত্মক ক্ষতিকর পোকা। এরা আম গাছের মুকুলের রস চুষে খাওয়ার ফলে ফুল কালো হয়ে ঝরে পড়ে। ম্যালাথিয়ন জাতীয় কীটনাশক ওষুধ প্রতি লিটার পানিতে ২ মি.লি. হারে মিশিয়ে গাছে সেপ্র করলে মুকুল ঝরা বন্ধ হবে। জংলী কুল গাছকে উন্নত মিষ্টি কুল গাছে পরিণত করতে হলে স্থানীয় কৃষি সমপ্রসারণ কর্মীর সহায়তায় কুল গাছ ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থা নিন।

তথ্যসূত্র: ফার্মহাউস

লিটার পদ্ধতিতে মুরগি পালন এবং প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়

লিটার পদ্ধতিতে মুরগি পালন এবং প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়
কৃষিবিদ মো. মহির উদ্দিন

আবহমান কাল থেকে গ্রাম বাংলার মানুষেরা ঘরের কোণে খানিক জায়গা করে অথবা খোয়াড় বা কুঠি তৈরি করে মুরগি পালন করে আসছে। এ ক্ষেত্রে গৃহকর্মের পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদেই সাধারণত গ্রামের মানুষেরা এভাবে মুরগি পালন করে থাকেন। কিন্তু মুরগি পালন এখন পেশা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই এখন সনাতন ধারার পদ্ধতির পরিবর্তে বৃহত্তর পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে আধুনিক পদ্ধতিতে মুরগি পালন করা হচ্ছে। আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে মুরগি পালনের বহুল প্রচলিত তিনটি পদ্ধতি হচ্ছে-

১. লিটার পদ্ধতি

২. খাঁচা পদ্ধতি

৩. মাচা পদ্ধতি

লিটার পদ্ধতি

লিটার অর্থ মুরগির বিছানা। মুরগি যে ঘরে লালন পালন করা হবে সে ঘরের ভেতরে মুরগির জন্য আরামদায়ক, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তথা উৎপাদন সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য মেঝেতে ধানের তুষ, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি বিছানো হয়। বাংলাদেশে ছোট এবং মাঝারি আকারের অধিকাংশ খামারেই ফ্লোর/লিটার পদ্ধতিতে মুরগি পালন করা হয়ে থাকে।

লিটার ব্যবহারের উদ্দেশ্য

ক. ফ্লোরে মুরগি পালনের ক্ষেত্রে লিটার ব্যবহার অনিবার্য। লিটার ব্যবহারের উদ্দেশ্য ঘরে মুরগির জন্য স্বাস্থ্যপ্রদ আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা দেশে দৃশ্যমান এ তিন সময়েই লিটার মুরগির জন্য আরামদায়ক অবস্থা রচনা করে।

খ. মুরগি যে পায়খানা করে তার জলীয় অংশ শোষণ করে ঘরকে রাখে শুকনা ও দুর্গন্ধমুক্ত।

গ. লিটার ব্যবহারের কারণে মুরগির পায়খানা মেঝেতে লেপ্টে যেতে পারে না।

ঘ. শীতকালে বাচ্চার ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

লিটার সামগ্রী যেমন হবে

ক. যে বস্তু বা দ্রব্যাদি লিটার হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তা হবে বহুল প্রচলিত নরম ও আরামদায়ক

খ. দ্রুত পানি ও আর্দ্রতা শোষণ ক্ষমতাসম্পন্ন

গ. সহজলভ্য

ঘ. দামে সাশ্রয়ী

ঙ. ব্যবহৃত লিটার সামগ্রী সার হিসেবে ব্যবহৃত হবে অর্থাৎ এর আর্থিক মূল্য থাকবে

চ. কম তাপ পরিবাহী হবে অর্থাৎ পরিবেশের তাপমাত্রায় বেশি উত্তপ্ত হবে না

ছ. আবহাওয়ার আর্দ্রতা কম শোষণ করার ক্ষমতা থাকবে অর্থাৎ খারাপ আবহাওয়ায় লিটার ড্যাম হবে না।

লিটার হিসেবে ব্যবহার্য দ্রব্য সামগ্রী

লিটার হিসেবে অনেক কিছু ব্যবহার করা যেতে পারে, আমাদের দেশে মাত্র দুটি বস্তু লিটার হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়-

১. ধানের তুষ

২. কাঠের গুঁড়া

এছাড়া আরো যে বস্তু লিটার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে তা হচ্ছে-

বালি, কাগজ, ভুট্টার মোচা চূর্ণ, গম বা ধানের খড়, শুকনা ঘাস, পাতা, চীনাবাদামের খোসা ।

যে ভাবে লিটার সামগ্রী সাজাবেন

মুরগির অনেকগুলো ¯^vfvweK আচরণের মধ্যে একটি হচ্ছে পা দিয়ে মাটি, ময়লা, খাদ্য আবর্জনা আঁচড়ানো। যে পদ্ধতিতেই মুরগি পালন করা হোক না কেন, এটা পরিলক্ষিত হবে। তাই মুরগির ঘরে লিটার বিছানোর সময় এ বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। মেঝের আয়তন অনুসারে লিটারের গভীরতা/ পুরুত্ব যদি কম হয়, তাহলে সহজেই পা দিয়ে সরিয়ে মেঝে বের করে পায়খানা করে ঘরকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলবে। বয়স অনুসারে ঘরে লিটারের গভীরতা হবে- বাচ্চার ক্ষেত্রে ২-৩ ইঞ্চি, পুলেট বা লেয়ারের ক্ষেত্রে ৪-৬ ইঞ্চি।

লিটার ব্যবস্থাপনা

লিটার ব্যবহারের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সুষ্ঠু লিটার ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। লিটার সামগ্রী শুকনা মেঝেতে বিছাতে হবে। লিটার সামগ্রী বিছানোর পর কোন আবর্জনা, শক্ত পদার্থ থাকলে তা বেছে ফেলতে হবে। ক্রয়ের সময় লিটার সামগ্রী ভেজা থাকলে, বিশেষ করে কাঠের গুঁড়া রৌদ্রে শুকিয়ে তারপর বিছাতে হবে। লিটার সামগ্রী ঘরে বিছানোর সময় আর্দ্রতা থাকবে ২০%; ব্যবহারের মাঝামাঝি ২০-২৫% এবং ব্যবহারের শেষে ৩০%। লিটারের আর্দ্রতা ২০% এর কম হলে অর্থাৎ লিটার খুব শুষ্ক হলে মুরগির দেহের জলীয় অংশ শুষে নেয় ফলে ডি-হাইড্রেশন হয়। লিটার খুব শুষ্ক হলে ঘর ধুলিময় হয়, এর ফলে ব্যবহৃত পানিতে ময়লা জমে। এ অবস্থায় পানি হালকাভাবে সেপ্র করে লিটারের আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় রাখতে হবে। আর্দ্রতা খুব বেশি হলে লিটার মুরগির পায়খানার জলীয় অংশ শোষণ করতে পারে না, বিধায় ঘরে লিটার ভেজা ভেজা হয় এবং দুগর্ন্ধ তৈরি হয়। কোন কারণে আর্দ্রতা বেশি হলে, কিছু শুকনা লিটার মিশিয়ে আর্দ্রতা কমানো যায়। তাছাড়া ঘরে বায়ু প্রবাহ চালানোর মাধ্যমে আর্দ্রতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনয়ন করা সম্ভব। লিটারের উপর মুরগির পায়খানা জমলে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে এবং গন্ধ তৈরি হলে ওলট পালট করে দিতে হবে। অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই যেন দুর্গন্ধ তৈরি না হয়। ব্যবহারের সময় পানি পড়ে বা অন্য কোন ভাবে ভিজে গেলে ভেজা অংশ তুলে নতুন লিটার সামগ্রী মেশাতে হবে। যখন দরকার মনে হবে, অর্থাৎ অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হলে ওলট পালট করে দিতে হবে, কোন অবস্থাতেই লিটার জমাট বাঁধতে দেয়া যাবে না। ডিমপাড়া অবস্থায় দিনের যে সময় সাধারণত ডিম দেয় না সে সময় লিটার উল্টিয়ে দিতে হবে, কারণ ডিম পাড়া অবস্থায় মুরগী বিরক্ত বোধ করলে উৎপাদন কমে যাবে।

লিটার পরিবর্তন ও পরিশোধন

লেয়ার বা ব্রয়লার যাই হোক প্রতি ব্যাচ মুরগি পালনের পর লিটার সামগ্রী পরিবর্তন/ফেলে দেয়া উচিত। বাচ্চা ব্রুডিং এ অবশ্যই নতুন লিটার ব্যবহার করতে হবে। নতুন বাচ্চার ক্ষেত্রে কোন অবস্থাতেই পুরাতন লিটার ব্যবহার করা যাবে না। পুরাতন লিটার ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। লিটার বিশুদ্ধকরণের জন্য প্রতি ১৫ বর্গফুট জায়গায় আধাকেজি হিসেবে সুপার ফসফেট মেশাতে হবে। পুরাতন লিটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে চুন বা সুপার ফসফেট মেশাতে হবে তারপর এক জায়গায় স্তূপ করে রাখতে হবে। এর ফলে লিটারের ভেতরে তাপ উৎপন্ন হয়ে রোগের জীবাণু মারা যাবে।

লিটার পরীক্ষা

লিটার পরীক্ষা বলতে লিটারে বিদ্যমান আর্দ্রতা পরিমাপকে বুঝায়। লিটারের আর্দ্রতা পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরী টেস্টের দরকার নেই। অভিজ্ঞতার আলোকেই সুচারুভাবে লিটার পরীক্ষা করা যায়। আমরা জানি ব্যবহৃত লিটারে আর্দ্রতা হবে ২০-৩০%। প্রথমে ১ মুঠো লিটার মুঠের ভেতর চাপ দিলে তিনটি অবস্থার একটি পরিলক্ষিত হবে।

ক. চাপ দেয়ার পর মুঠ খুললে যদি লিটার জমাট না বাঁধে বা ঝরে না যায় তাহলে বুঝতে হবে লিটারের আর্দ্রতা ২০-৩০% এর মধ্যে আছে।

খ. যদি ঝরে পড়ে তাহলে বুঝতে হবে লিটারের আর্দ্রতা ২০%এর নিচে।

গ. যদি জমাট বাঁধে তাহলে বুঝতে হবে আর্দ্রতা ৩০% এর উপরে ।

লিটার ব্যবহারের সময় লিটারের আর্দ্রতা পরীক্ষা ছাড়াও লিটারের অবস্থা পরীক্ষা করতে হবে। যেমন লিটার সামগ্রীর স্বাভাবিক রঙ অর্থাৎ যে দ্রব্য সামগ্রী লিটার হিসেবে ব্যবহার করা হবে, তা যদি পচা বা তার স্বাভাবিক রঙ নষ্ট থাকে তাহলে তা ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

মাংস ও ডিম উৎপাদনে লিটারের প্রভাব

লিটার পদ্ধতিতে মুরগি পালনের ক্ষেত্রে লিটারের আর্দ্রতাজনিত উল্লেখিত তিন অবস্থা মুরগির সুস্থতা, দৈহিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনে প্রভাব বিস্তার করে।

ক. স্বাভাবিক লিটার (আর্দ্রতা ২০-৩০%)

খ. শেড/মুরগির ঘর শুষ্ক ও দুর্গন্ধমুক্ত থাকবে

গ. মুরগি স্বস্তিতে থাকবে

ঘ. খাদ্য রূপান্তর হার বেশি হবে

ঙ. লিটারে উৎপাদিত খাদ্য কণা ভালোভাবে গ্রহণ করবে

চ. মুরগির স্বাভাবিক উৎপাদন, বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

লিটার শুষ্ক হলে

ক. লিটারের আর্দ্রতা খুব কম হবে মুরগির শরীরের জলীয় অংশ শোষণ করে পানিশূন্যতা তৈরি করে।

খ. মুরগি অস্বস্তিতে থাকবে

গ. ক্যানাবলিজম (ঠোকরানো আচরণ) হবে

ঘ. পানি পান করার প্রবণতা বেশি হবে অর্থাৎ পানি বেশি পান করবে, ফলে খাদ্য কম খাওয়ার কারণে শরীরে পুষ্টি ঘাটতি হতে পারে।

ঙ. ঘর ধুলিময় হবে।

লিটারের আর্দ্রতা বেশি হলে

ক. ঘরে গ্যাস তৈরি হবে

খ. ককসিডিওসিস কৃমির প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে

গ. ফুট প্যাড লিসন (Foot Pad lesion) হবে

ঘ. বাচ্চার পালক গজানোর হার কম হবে ফলে দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে

ঙ. আর্দ্রতা বেশি হলে ইনটেস্টাইনাল (Intestinal) ট্রাক থেকে পানি শোষণ কমে যায় এর ফলে পায়খানায় পানির পরিমাণ বেড়ে যাবে।

লেখক : ব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত)
সরকারি হাঁস-মুরগি খামার, রাজবাড়ি

মুরগির গামবোরো রোগ ও কার্যকর ভ্যাকসিন কর্মসূচি

মুরগির গামবোরো রোগ ও কার্যকর ভ্যাকসিন কর্মসূচি
ডা. এ এইচ এম সাইদুল হক

পোলট্রি শিল্পে মারাত্মক বিপর্যয়কারী রোগের মধ্যে যে কয়েকটি রোগ চলে আসে তার মধ্যে গামবোরো বা ইনফেকসাস বারসাল ডিজিজ অন্যতম যা প্রথম দেখা দেয় ১৯৬২ সালে আমেরিকার গামবোরো নামক জেলায়।
কারণ

এ রোগের কারণ হচ্ছে RNA ভাইরাস। সব দেশের মুরগিতে এ রোগ দেখা যায়, রোগের সুপ্তিকাল ২-৩ দিন। ব্রয়লার মুরগি বা ৪-২২ সপ্তাহ বয়সের লেয়ারে এ রোগের প্রকোপ অত্যন্ত বেশি। তবে আমাদের দেশে ১৮ দিনের অধিক মুরগিতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। প্রথম ২দিন মৃত্যুহার আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। ৪দিন পর উপসর্গ দেখা দেয়াসহ সর্বোচ্চ মৃত্যুহার হয় এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক হয়ে আসে। ফ্লকে মুরগি আক্রান্তের হার পরিবর্তনশীল এবং ১০০% পর্যন্ত হতে পারে। মৃত্যুহার সাধারণত ৫% হতে শুরু করে ব্রয়লারে ২৫% এবং লেয়ারে ৩৫%-৮০% পর্যন্ত হতে পারে। এ ভাইরাস অত্যন্ত জীবনীশক্তিসম্পন্ন এবং সাধারণ অবস্থায় মুরগির লিটারে ও ফার্মের পারিপার্শ্বিক এলাকায় ১২০ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এ ভাইরাস এতই শক্তিশালী যে মুরগির দেহের বাইরে, ঘরের ভেতর, পরিচর্যাকারীর জামা কাপড়ে, খাদ্যে, খামারের সরঞ্জামে এবং আশপাশের মাটিতে চার মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে প্রথম এ রোগের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।

পোস্টমর্টেম বা ময়না তদন্ত রিপোর্ট

এ রোগে বারসা অব ফেব্রিকাস সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এ রোগের প্রথম দিকে এটা ফুলে অনেক বড় হয় এবং শেষের দিকে সেটা ছোট হয়ে স্বাভাবিকের ১/৩ শতাংশ হতে দেখা যায় এবং ধূসর বর্ণ ধারণ করে। বারসার ভেতরে রক্তক্ষরণের চিহ্ন এবং অনেক সময় সাদা পনিরের ন্যায় পদার্থ দেখা যায়। বৃক্ক বা কিডনীতে ইউরেট জমার কারণে তা ফুলে যায়। বুক ও রানের মাংসে বিন্দু বিন্দু রক্ত জমে থাকতে দেখা যায়। অনেক সময় যকৃত স্ফীত এবং রঙিন মার্বেলের মতো দেখায়। গিজার্ডের সেরাস পর্দায় এবং প্রভেন্ট্রিকুলাসের মিউকাস পর্দায়ও রক্তক্ষরণ ঘটে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ব্রয়লারের ক্ষেত্রে দৈহিক বৃদ্ধি একেবারেই কমে যায় এবং খাদ্য রূপান্তর হারের অনুপাত খুব বেড়ে যায়। আই বিডি ভাইরাস বাচ্চার দেহে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় লিম্ফোসাইট তৈরির উৎসে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এর ফলে তাদের ইমিউন সিস্টেম ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় ও প্রচুর বাচ্চার মৃত্যু ঘটে এবং এর সাথে সাথে অন্যান্য রোগ যেমন রানীক্ষেত, মারেক্স রোগ, কক্সিডিওসিস, কলিব্যাসিলোসিস প্রভৃতির প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে।

রোগ নির্ণয়

১. রোগের লক্ষণ দেখে

২. পোস্টমর্টেম চিহ্ন দেখে

৩. জীবাণুর কালচার করে

৪. বিভিন্ন সেরোলজিক্যাল টেস্ট

৫. সমজাতীয় রোগ থেকে পৃথক করতে হবে যেমন- রানীক্ষেত, ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, ভাইরাল রেসপিরেটরী রোগ, ইনফেকশাস করাইজা ইতাদি।

৬. তুলনীয় রোগ: গামবোরো রোগের পোস্টমর্টেম এর সময় যে চাক্ষুষ পরিবর্তন দেখা যায় তার সাথে অনেক রোগের রোগ নির্ণয়ে ভুল হতে পারে। যেমন- ক) রানীক্ষেত রোগ খ) মারেকস রোগ গ) তৃষ্ণাতে মৃত্যু ঘ) হেমোরেজিক সিনড্রোম।

প্রতিরোধ

স্বাস্থ্যবিধি এবং জীব নিরাপত্তা সঠিকভাবে পালন করতে হবে। একটি কার্যকর গামবোরো রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনটি বিষয়কে জোর দিতে হবে:

ক. ব্রিডারে কার্যকর ভ্যাকসিন কর্মসূচি

খ. কার্যকর বায়োসিকিউরিটি কর্মসূচি

গ. ব্রয়লারে কার্যকর ভ্যাকসিন কর্মসূচি

সঠিকভাবে ভ্যাকসিন কর্মসূচি প্রণয়নে মেটারনাল এন্টিবডি লেভেল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভেটেরিনারিয়ান বা পোলট্রি বিশেষজ্ঞ এর সাথে পরামর্শ করে ভ্যাকসিন প্রয়োগের সঠিক সময় নির্ধারণ করা উচিত।

মেটারনাল এন্টিবডি

প্যারেন্ট থেকে প্রাপ্ত এন্টিবডি রক্ত হয়ে ইয়কস্যাক এর মাধ্যমে ভ্রূণে চলে আসে। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটার পর এন্টিবডি কিছুদিন বাচ্চার দেহেও থেকে যায়। প্যারেন্ট মুরগির এন্টিবডি টাইটার বেশি হলে বাচ্চার দেহেও এন্টিবডি টাইটার বেশি হবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ম্যাটারনাল এন্টিবডির পরিমাণ কমতে থাকে। MDA যখন নিচে নেমে আসে তখন টিকা প্রয়োগে ভালো ফল পাওয়া যায়।

মুরগিতে গামবোরো ভ্যাকসিন কর্মসূচি প্রণয়নে নিচের ফ্যাক্টরগুলো বিবেচনায় রাখতে হবে

১. যদি MDA এর uniformity ভালো থাকে তবে ব্রয়লারে একটি ভ্যাকসিনই যথেষ্ট, কারণ এক্ষেত্রে ফ্লকের বেশিরভাগ একদিন বয়সী বাচ্চাতে একই মাত্রার MDA বজায় থাকে।
২. যদি MDA এ uniformity ভালো না থাকে অর্থাৎ CV ৩০% এর উপরে হয় তবে একটির পরিবর্তে দুইটি ভ্যাকসিন প্রয়োজন হবে। কারণ এক্ষেত্রে MDA এর ব্যাপক তারতম্য থাকে এবং বেশিরভাগ মুরগিতে উঁচুমাত্রার MDA থাকে বিধায় ভ্যাকসিনের প্রতি সংবেদনশীল হয় না। এ অবস্থায় মুরগিতে MDA লেভেল নিচু থাকা অবস্থায় প্রথম ভ্যাকসিন দেওয়া হয় এবং ৬ দিনের মধ্যে দ্বিতীয়টির প্রয়োজন হয় উঁচুমাত্রার MDA বিদ্যমান মুরগিকে রক্ষা করতে।
৩. সঠিক ভ্যাকসিন কর্মসূচি প্রণয়ন করতে হলে MDA লেভেল জানা থাকতে হবে।
৪. CVT (Central Vaccination Time) নির্ণয় করার মাধ্যমে ব্রিডারে ভ্যাকসিন কর্মসূচি নির্ধারণ করা।

ব্রিডারের ক্ষেত্রে

ব্রিডারে প্রাথমিক ভ্যাকসিন কর্মসূচি প্রথম সপ্তাহে শুরু হয় যাতে কমপক্ষে দুটো ভ্যাকসিন দিতে হবে। এরপর ব্রিডার পুলেট একটি অতিরিক্ত ভ্যাকসিন প্রয়োজন হতে পারে। এ হতে পারে primer হিসাবে লাইভ ভ্যাকসিন (মূলত ইন্টারমিডয়েট প্লাস টাইপ) ৮ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে) দেয়ার পর একটি বিকল্প ভ্যাকসিন ডিমপাড়ার পূর্বে দিতে হবে। এরপরও যদি MDA লেভেল অপর্যাপ্ত বা এর Homogenicity বজায় না থাকে তবে ২য় একটি কিলড ভ্যাকসিন ৪৫ সপ্তাহ বয়সে প্রদান করা যেতে পারে। কিছু ব্রিডার কোম্পানিতে ইন্টারমিডিয়েট প্লাস টাইপ ভ্যাকসিনের পরিবর্তে ইন্টারমিডিয়েট ও কিলড ভ্যাকসিন একসাথে প্রদান করে কারণ ইন্টারমিডিয়েট প্লাস দেওয়ার পর জীব নিরাপত্তা মৌলিক ব্যবস্থাপনা কর্মসূচিকে জোর দিতে হবে যেমন:

১. ফার্মের প্রবেশ পথ বহিরাগতদের জন্য ৩৫ দিন বয়স পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে।

২. শেডে প্রবেশের সময় ফুটপ্যাডে পা ডুবানো ও পরিশুদ্ধ হওয়া।

৩. একাধিক শেড হলে প্রতি শেডের জন্য স্বতন্ত্র জুতা ও পোশাক পরার ব্যবস্থা করা।

৪. এক শেডের লোক অন্য শেডে যাতায়াত বন্ধ করতে হবে।

৫. ফার্মে যানবাহন প্রবেশের পূর্বে প্রবেশদ্বারে ফুটবাথে জীবাণুনাশক পানিতে যানবাহনের চাকা ভিজিয়ে প্রবেশ করাতে হবে।

৬. ভিন্ন ব্যাচের বাচ্চা থাকলে প্রথমে কম বয়সের বাচ্চা এবং পরে বেশি বয়সের বাচ্চা পরিচর্যা করতে হবে।

৭. প্রতিবার বাচ্চা উঠার পূর্বে ঘর পরিষ্কার, জীবাণুমুক্ত ও ফিউমিগেশন করতে হবে। ফিউমিগেশন এর জন্য ১০০ ঘনফুট আয়তনের ঘরে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ৬০ গ্রাম, ফরমালিন ১২০ মিলি এ হারে মিশাতে হবে। উন্নত জীবাণুনাশক যেমন ০.২-০.৫% সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইড বা আয়োডিন দ্রবণ ব্যবহার করা ভালো।

৮. কোন ফ্লকে গামবোরো দেখা দিলে পরবর্তী ব্যাচ করার পূর্বে কমপক্ষে ৩ সপ্তাহ (মতান্তরে ১০দিন) বিরতি দিতে হবে এবং পূর্বে ব্যবহার্য লিটার, বিষ্ঠা ও মুরগির খাদ্য সরিয়ে ফেলতে হবে। এছাড়া বাচ্চা তোলার পূর্বে ফরমালডিহাইড দ্বারা ফিউমিগেশন বা ফেনলিক যোগ ব্যবহার করতে হবে।

৯. মুরগির খাচা, খাবারের পাত্র, পানির পাত্র, মেঝে, দেয়াল ইত্যাদি ডিটারজেন্ট এবং উচ্চচাপযুক্ত পানির প্রবাহ দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

ব্রয়লারের ক্ষেত্রে

যে সমস্ত এলাকায় অতিতীব্র IBD এর প্রাদুর্ভাব বেশি ঐ সমস্ত ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন কর্মসূচিতে ইন্টারমিডিয়েট প্লাস ভ্যাকসিন ব্যবহার করতে হবে। যদি উন্নত মানের বাচ্চা, যার উচ্চ ও সুষম MDA টাইটার লেভেল বিদ্যমান ঐ সমস্ত ক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৬ দিন বয়সে (MDA টাইটার অনুসারে) একটি মাত্র ভ্যাকসিন জবাই করার পূর্ব পর্যন্ত ভালো নিরাপত্তা দিতে সক্ষম। আবার যদি দুটি ভিন্ন ব্রিডার এর ফ্লক লেভেল এবং অপরটি বয়সী (যার নিচু মাত্রার MDA লেভেল) বাচ্চা একত্রে পালন করা হয় অথবা ঝাঁকের সুষমতার মান খারাপ হয় ঐ ক্ষেত্রে দুটো ভ্যাকসিন দেয়াই উত্তম। এক্ষেত্রে দুটো ভ্যাকসিন এর প্রথমটি ৭ হতে ১০ দিন বয়সে (ইন্টারমিডিয়েট ভ্যাকসিন- ফ্লকের হেটারোজেনিসিটি ঠিক করার জন্য) এবং দ্বিতীয়টি ১২ হতে ১৬ দিন বয়সে (ইন্টারমিডিয়েট প্লাস ভ্যাকসিন) দিতে হবে।

ব্রয়লারের ক্ষেত্রে একটি লাইভ ভ্যাকসিন ৫-৭ দিন পর্যন্ত গামবোরো রোগকে ভালোভাবে প্রতিরোধ করতে পারে কারণ এর মধ্যে ভ্যাকসিনটি ম্যাটারনাল এন্টিবডি ব্যারিয়ারকে অতিক্রম করে বারসাতে প্রবেশ করে। তাই ভ্যাকসিন শিডিউল এমনভাবে করা উচিত যাতে সম্ভাব্য গামবোরো রোগ আক্রমণের ৫-৭ দিন পূর্বেই ভ্যাকসিন দেয়া সম্ভবপর হয়।

বাণিজ্যিকভাবে লেয়ার পুলেটের ক্ষেত্রে ব্রয়লারের তুলনায় লেয়ার পুুলেটদের জীবনকাল যেহেতু দীর্ঘ সেহেতু জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদেরকে সাধারণত টিকা প্রদানের জন্য তেমন জোর দেয়া হয় না। লেয়ার পুলেটদের ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ বয়সের মধ্যে নিচের দুটো option এর যে কোনটি গ্রহণ করা যেতে পারে।


প্রথম option

ক. উন্নত মানের বাচ্চার ক্ষেত্রে (উচ্চ ও সুষম ৯ MDA) : ইন্টারমিডিয়েট প্লাস ভ্যাকসিন ২০-২৬ দিন প্রথমটি এবং ৮ম হতে ১০ ম সপ্তাহান্তে আরেকটি।

খ. নিম্নমানের বাচ্চার ক্ষেত্রে (নিচু ও অসম MDA): ইন্টারমিডিয়েট ভ্যাকসিন ৫ম-১০ম দিনে প্রথমটি, ইন্টারমিডিয়েট পাস ভ্যাকসিন ১৬-২২তম দিন দ্বিতীয়টি এবং ৮ম হতে ১০ম সপ্তাহান্তে তৃতীয়টি।

যেহেতু গামবোরো ভাইরাসের primary tropism হলো GUT এর লিম্ফয়েড অঙ্গসমূহ তাই ভ্যাকসিনসমূহ পানির মাধ্যমে দেয়াটাই সর্বোত্তম। Per-oral এবং চোখের মাধ্যমেও কার্যকর কিন্তু এটি কম প্রচলিত ও খুবই ব্যয়বহুল (১০ দিনের নিচের বাচ্চাদের দেয়া যেতে পারে)। এছাড়া পানির ক্লোরিনের ক্ষতিকর প্রভাবকে দূর করে এবং ভ্যাকসিন ভাইরাসের কার্যকারিতা অক্ষুণ্ন রাখে এ রকম স্ট্যাবিলাইজিং এজেন্ট দেয়া উচিত।

চিকিৎসা

সব ভাইরাসের মতো এ ভাইরাসেরও তেমন কার্যকরী চিকিৎসা নেই। এ রোগের সাথে ২য় পর্যায়ের ব্যাকটেরিয়া হিসেবে সালমোনেলা ও ই-কলাইয়ের সংক্রমণ এবং রক্ত আমাশয় এর সংক্রমণ হতে পারে। তাই ব্যাকটেরিয়াল রোগ থেকে রক্ষার জন্য অক্সিটেট্রাসাইক্লিন এবং কুইনোলন গ্রুপ (সিপ্রোফ্লকসাসিন, এনরোফ্লকসাসিন, নরফ্লকসাসিন) এর মধ্যে যে কোন একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যায় এবং রক্ত আমাশয় থাকলে এমপ্রোলিয়াম বা টলট্রাজুরিল যুক্ত এন্টিকক্সিডিয়াল ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। পানি শূন্যতা রোধ করার জন্য ইলেকট্রোলাইটযুক্ত স্যালাইন এবং এসিডিফায়ার দেয়া যেতে পারে। ভালো ভেন্টিলেশন, উষ্ণ তাপমাত্রা এবং পর্যাপ্ত সুপেয় পানি এ সময় নিশ্চিত করা বিশেষ প্রয়োজন। এ সময় খাদ্য তালিকায় প্রোটিনের মাত্রা ৪-৫ দিনের জন্য কম রাখলে মুরগি দ্রুত সেরে উঠে।
তথ্যসূত্র: ফার্মহাউস

মা চিংড়ি

এক সাদা সোনার সন্ধানে
গৌতম কুমার রায়


বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আয়ের উৎস চিংড়ি। চিংড়িকে ঘিরে জাতীয় আয়ের পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে কর্মসংস্থান এবং প্রসারতা লাভ করেছে মৎস্য শিল্পের। গলদা চিংড়ি দেশের প্রায় সর্বত্র চাষযোগ্য হওয়ায় দেশের মানুষের আমিষ খাদ্যের যোগান দিচ্ছে আর বাগদা চিংড়ি রপ্তানি পণ্যের তালিকায় স্থান করে নেয়ায় এই শিল্পের হিমায়িত খাদ্য হতে গত ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে দেশ আয় করেছে ৫১৫.৩২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা মোট রপ্তানি আয়ের ৪.২০ শতাংশ। অথচ হিমায়িত খাদ্যের এই রপ্তানি খাত শুধু মা বাগদা চিংড়ির দুষপ্রাপ্যতার কারণে হয়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশের মোট ভূমির পরিমাণ ১.৪৪ কোটি হেক্টর। দেশে উর্বরা সমুদ্র এলাকা রয়েছে ৪৮০ কি.মি., তটরেখা ২০০ নটিক্যাল মাইল। যা কিনা এ দেশের মূল ভূ-খণ্ডের চেয়েও বড়। এর মধ্যে উপকূলীয় অর্থাৎ সমুদ্র সংযোগ স্থল ও ৫ পিপিটি লবণাত্মক এলাকা রয়েছে ১৭ শতাংশ। বিশাল সমুদ্র জলরাশিতে বাগদার মা-চিংড়ি আজ দুষপ্রাপ্য। যে জন্য আমরা প্রাকৃতিক পরিপক্ব চিংড়ি পোনার ব্যাপক চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছি। দেশে হ্যাচারীতে যে চিংড়ি পোনা উৎপন্ন হয় তা দিয়ে প্রকৃত চাহিদার শতকরা ৫ ভাগ পূরণ করা সম্ভব। অথচ অবশিষ্ট শতকরা ৯৫ ভাগ বাগদা চিংড়ির পোনার জন্য আমাদের নির্ভরতা প্রাকৃতিক চিংড়ির পোনার ওপর। যদিও প্রাকৃতিক পোনার যোগান ব্যবস্থা বেশ কষ্টসাধ্য। তারমধ্যে প্রাপ্য পোনার শতকরা ১৯ ভাগ পোনা বেঁচে থাকে সংগ্রহকালীন সময় পর্যন্ত। অর্থাৎ পোনা সংগ্রহ, পরিবহন এবং তা প্রতিপালনের পদ্ধতিগত অভাবের কারণেই অল্প সময় পর্যন্ত এই টিকে থাকা।

আমাদের দেশে কিছুদিন ধরেই চিংড়ির রেণু পোনার অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মা চিংড়ির দুষপ্রাপ্যতার জন্য দেশের ৫৩টি হ্যাচারীর মধ্যে ৪০টিতেই মা চিংড়ির উৎপাদিত বন্ধ। বিভিন্ন কারণে প্রকৃতিগতভাবে মা চিংড়ি এবং প্রাকৃতিক চিংড়ি পোনা অহরহ পাওয়া যাচ্ছে না। সাগরে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ট্রলিং এবং নির্বিচারে চিংড়ি পোনা ধরার ফলে মা চিংড়ির সংকটের তীব্রতা বাড়ছে। আশির দশকের কিছু পূর্ব হতে প্রাকৃতিক উৎস থেকে বাগদা চিংড়ির পোনা আহরণের প্রবণতা দেখা যায়। বছরে এখনও ২০০ কোটিরও বেশি বাগদা পোনা আহরণ করা হয়। এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এই চিংড়ি ধরতে গিয়ে ৯৯টি অন্যান্য চিংড়ি মাছ ও অন্যান্য জু-প্লাঙ্কটন মারা যায়। ফলে প্রতি বছর সাগরের অনেক চিংড়ি ও মাছ শুধু বেঁচে না থাকতে পেরে তারা যেমন বড় হতে পারছে না আবার বিপুল সংখ্যক চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ যা বড় হওয়ার আগেই তাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। এই পোনা সংগ্রহ করতে অধিকাংশ অপ্রশিক্ষিত নারী ও শিশুরা কাজ করে থাকে এবং এরা মৌসুমী জেলে হিসেবে এ পেশাকেও মৌসুমী পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। বাগদা চিংড়ির অধিকতর উৎপাদনের জন্য এর পোনা পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ করা জরুরি। তবে বাগদার মা চিংড়ি দুষপ্রাপ্যতার জন্য আরো কিছু বিষয়ে বাস্তব ভিত্তিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কেননা মা চিংড়ি ব্যবস্থাপনার অন্তরায়গুলোকে চিহ্নিত করার এখনই সময়। যেমন- কক্সবাজার জেলার সেন্টমার্টিন সংলগ্ন এ্যালিফ্যান্ট পয়েন্ট ও খুলনা-সাতক্ষীরা জেলার সুন্দরবন সংলগ্ন কোহিনুর পয়েন্টে যেভাবে অদক্ষ মৌসুমী জেলেরা অপরিকল্পিতভাবে নির্বিচারে চিংড়ির পোনা ধরে থাকে তা থেকে নিয়মিত মনিটরিং করে পদ্ধতিগত আহরণের অভ্যাস তৈরি করা জরুরি। মা চিংড়ি ধরার জন্য অতিরিক্ত কিছু জাহাজকে ট্রলিং এর কাজে ব্যবহার করলে ভালো হয়।

টেকনাফ হতে শরণখোলা পর্যন্ত বিশাল উপকূলীয় এলাকাতে চিংড়ির পোনা ধরার সময় অন্যান্য বিভিন্ন প্রজাতির জলজ সম্পদ অপ্রয়োজন ভেবে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে তা এখন অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে অপ্রয়োজনীয় রেণু/ডিম যেন পানিতে ছেড়ে দেয়া হয় সে ব্যাপারে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া দরকার।

প্রতিটি ট্রলিং জাহাজগুলোর ম্যান পাওয়ার বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন ঘটিয়ে কাজে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। ১৯৮৩ সালে প্রণীত আইন অনুযায়ী সাগরের ৪০ মিটার গভীরতার বাইরে মা চিংড়ি ধরার বিধান রয়েছে। অথচ সমুদ্রে বাগদা মা চিংড়ির বিচরণ ক্ষেত্র ৪০-৮০ মিটার গভীরতায়। ডিম পাড়ার সময় এরা ১৮-৪০ মিটার গভীর পানিতে চলে আসে। আবার সাগরের লবণাক্ততা কমে যাওয়ায় মা চিংড়ি স্থান পরিবর্তন করে এই গভীরতায় অর্থাৎ সাগর তীর অভিমুখে স্থান পরিবর্তন করছে। যেজন্য ফিসিং এ নিয়োজিত ট্রলারকে ২০-৩০ মিটার গভীরতার মধ্যে ট্রলিং করার অনুমতি দিলে মা চিংড়ি পাওয়া যেতে পারে।

প্রজনন মৌসুমে চিংড়ির বিচরণ এলাকায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত যে কোন ট্রলিং বা চিংড়ির পোনা আহরণ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে প্রাকৃতিক প্রজননের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে। অর্থাৎ অভয় প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করে দিলে সুস্থ সবল পোনা প্রাপ্যতা সম্ভব হবে।

শুধু সাগরের প্রাকৃতিক প্রজননের ওপর নির্ভর না করে হ্যাচারীতে অথবা পুকুর বা ঘেরে কিভাবে প্রজননক্ষম মা চিংড়ির ব্রীড ঘটানো যায় তার উপায় উদ্ভাবন করা খুবই জরুরি। একটি মা চিংড়ি সাগর স্থলে প্রাকৃতিক পরিবেশে ২-৮ লাখ পর্যন্ত ডিম ছেড়ে থাকে, আবার পুকুর বা ঘেরে ঐ চিংড়ি ০.৫-২ লাখ পর্যন্ত ডিম ছাড়তে সক্ষম। অর্থাৎ বিশেষ সুবিধা হলো, ঘেরের মা চিংড়ির মূল্য বেশ কম এবং তা সচরাচর সহজপ্রাপ্যও বটে।

বাগদা দেশের সাদা সোনা হিসেবে পরিচিত। একটু পদ্ধতিগত দিক বিবেচনা করে খুব সহজে অনেক বিদেশী অর্থ আয় করা সম্ভব এ খাত থেকে। কেননা ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে পর্যন্ত সময়ে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয় ১৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আবার ২০০৭-২০০৮ অর্থ বছরে ঐ সময়ে ১৫৪.৬২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আয় সম্ভব হয়েছিল ১৪১.৭৭ মি. মার্কিন ডলার। এত অল্প সময়ে অনেক রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য মা চিংড়ির উৎপাদন সহজলভ্যতা এবং তা থেকে পদ্ধতিগতভাবে প্রজননের মাধ্যমে চিংড়ি পোনা উৎপাদন করলে এ খাতে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাম্পার ফলন ফলান সম্ভব হবে। পরিবেশগত পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের জলজ সম্পদে বিশেষ করে মা বাগদা চিংড়ির বিচরণ ও প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করা গেলে আমাদের বিশাল সামুদ্রিক জলরাশির প্রতিটি ফোঁটাকে সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: ফার্মহাউস

বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল বাগান টেকসই ও লাভজনক ফসল উৎপাদন ও ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহারের একটি সার্থক মডেল

প্রফেসর ড. এম এ রহিম ও শামছুল আলম মিঠু

বাংলাদেশের মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কি.মি.। চাষযোগ্য আবাদি জমির পরিমাণ ৮২ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর। চাষযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ ৩.২৩ লাখ হেক্টর। নিট ফসলি জমির পরিমাণ ৮০.২৪ লাখ হেক্টর এবং মোট ফসলি জমি ১৪২.২২ লাখ হেক্টর এবং বনাঞ্চলের আয়তন ১৯,৭১০ বর্গ কি.মি.। এই ৮২.৯০ লাখ হেক্টর জমি থেকে খাবার আসছে প্রায় ১৪.৫৯ কোটি জনগোষ্ঠীর। গত ত্রিশ বছরে জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে বাস করছে গড়ে ৯১৩ জন মানুষ, ফলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ একদিকে যেমন কমে যাচ্ছে সেই সাথে কমছে চাষযোগ্য জমির পরিমাণও। অন্যদিকে মোট খাদ্য শস্যের চাহিদা ২৩৮.৫৪ লাখ মেট্রিকটন কিন্তু উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাই অতিরিক্ত খাদ্য ঘাটতি মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশী খাদ্য আমদানির ওপর এবং দাতা গোষ্ঠীর সাহায্যের ওপর। আবার একজন মানুষের শারীরতাত্ত্বিকভাবে ও মানসিকভাবে সুস্থতার জন্য ৮৫ গ্রাম করে ফল খাওয়ার প্রয়োজন। কিন্তু আমরা পাই মাত্র ৩৮ গ্রাম যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তাই জাতীয় চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের বনভূমি বা কৃষি জমি বাড়ার যেখানে কোন সম্ভাবনা নেই, সেখানে ফল ও বনজ গাছের সাথে কৃষি/উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলের মিশ্র চাষের সমান্তরাল চাষ বিন্যাসকে কয়েকটি স্তর বিশিষ্ট উল্লম্ব চাষ বিন্যাসে রূপান্তরের মাধ্যমে বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল বাগান করে একক জমিতে ফলন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত বৃক্ষরাজি বিভিন্ন স্তর থেকে সূর্যালোক গ্রহণ করে এবং এদের মূলতন্ত্র বিভিন্ন গভীরতা থেকে মৃত্তিকা পুষ্টি উপাদান নিয়ে থাকে। ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের (আলো, মৃত্তিকা পুষ্টি উপাদান, পানি ইত্যাদি) সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্যও রক্ষিত হয়। এ ছাড়াও এ পদ্ধতিতে একই জায়গায় প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন বৃক্ষরাজির সমাবেশ ঘটে ফলে উদ্ভিদ বৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব হয়। এ পদ্ধতি অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক। কৃষি ফসল উৎপাদনও ঝুঁকি মুক্ত। কেননা যে কোন একটি উল্লম্ব স্তরের ফসলের ফলন খারাপ হলেও অন্যান্য স্তরের ফলন পাওয়া যায়। বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের কাঠামো

মূলত বহুস্তর বিশিষ্ট বাগান হচ্ছে বিভিন্ন চাষযোগ্য বৃক্ষ, বিরুৎ ও গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ প্রজাতির বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ ৩-৪ স্তর বিশিষ্ট উল্লম্ব ক্যানোপি সহযোগে গঠিত উদ্ভিদ সমূহের একটি নিবিড় সহাবস্থান। নিম্নের চিত্রে একটি পরিকল্পিত বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের মডেল উপস্থাপন করা হলো।



বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বসতবাড়িই এক একটি অপরিকল্পিত বহুস্তর বিশিষ্ট বাগান বা বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল চাষ ক্ষেত্র। কারণ দেশজ সব ধরনের ফল, শাকসবজি, জ্বালানি এবং আসবাব তৈরির কাঠ আসে বসতবাড়ি, বসতবাড়ি সংলগ্ন আঙিনা অথবা বসতবাড়ির সাথে সংযুক্ত ক্ষুদ্র ভূমিখণ্ড থেকে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায় ২২ লাখ বসতবাড়িতে আপাতঃদৃষ্টিতে যে বহুস্তর ফসল বাগানের কাঠামো বর্তমান আছে তা অপরিকল্পিত হওয়ায় সে সব বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল উৎপাদন কাঠামো হতে সর্বাধিক ফসল আসছে না। পরিকল্পিতভাবে এসব স্থানে যদি বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল উৎপাদন করা যায় তবে এসব বাগানের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। বিষয়টির ওপর গবেষণা করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব খামারে ১৯৯১ সাল থেকে পরিকল্পিতভাবে বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল চাষের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আম, নারিকেল, নিম ও শিশু বাগানের নিচে মধ্য স্তরে সফলভাবে কলা, লেবু, পেয়ারা, পেঁপে এবং সর্বনিম্ন স্তরে আনারস, আদা, হলুদ, কচু, রসুন এবং ওষুধি উদ্ভিদ অ্যালোভেরা, অ্যাসপ্যারাগাস, মিসরিদানা প্রভৃতি ফলানো সম্ভব হয়েছে। এ পদ্ধতিতে বৃক্ষরাজি বিভিন্ন স্তর থেকে সূর্যালোক গ্রহণ করে। আমাদের মোট যে সূর্যের আলো পৃথিবীতে আসে তার ২০-৩০ ভাগ ব্যবহার করে উপরের স্তর অর্থাৎ বৃক্ষ, ২০-৪০ ভাগ ব্যবহার করে মধ্য স্তর অর্থাৎ গুল্ম এবং ২০-৩০ ভাগ সূর্যের আলো গ্রহণ করে যা সর্বনিম্ন স্তরে থাকে যা ছায়া পছন্দকারী/ছায়া সহ্যকারী উদ্ভিদ। এছাড়া এদের মূলতন্ত্র মাটির বিভিন্ন গভীরতা থেকে পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে যেমন ছায়া পছন্দকারী/সহ্যকারী উদ্ভিদ যা মাটির উপরের স্তর থেকে পুষ্টি নেয়, মধ্যম স্তরের উদ্ভিদ যা মাটির আরো নিচে এবং উপরের স্তরের উদ্ভিদ মাটির আরো গভীর থেকে পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে। এতে করে প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক ভারসাম্যও রক্ষা হয়।



নারিকেল বাগানে তিন স্তর বিশিষ্ট ফসল চাষ

গ্রাম ও খামার বনায়ন প্রকল্পের অধীনে উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ স্তর বিশিষ্ট (চিত্র -২) যে ফসল চাষ করে তার ১ম স্তর কচু, আদা, হলুদ, আনারস, অ্যালোভেরা, এ্যাসপ্যারাগাস, মিসরিদানা, ২য় স্তর কলা, লেবু, পেঁপে ও পেয়ারা এবং ৩য় স্তর নারিকেল গাছের সমন্বয়ে গঠিত, যা বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল চাষের ইতিবাচক দিক নির্দেশক এবং অর্থনৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য। চার বছর গবেষণার পর দেখা গেছে যে, শুধু নারিকেল থেকে প্রতি বছর হেক্টরপ্রতি ৪৮,০০০ টাকার মতো আয় হয় কিন্তু বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল বিন্যাস (নারিকেল + কলা + আনারস + আদা/কচু) থেকে ৩-৪ গুণ বেশি আয় করা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, নারিকেল গাছ তার নিম্নস্তরে চাষকৃত ফসলের পরিচর্যা থেকে পরোক্ষভাবে উপকার পেয়ে থাকে।



আম বাগানে তিন স্তর বিশিষ্ট ফসল চাষ

আম আগানে পেঁপে এবং আনারস ভালো জন্মে। ফল গাছ উন্নয়ন প্রকল্পের আম বাগানে পেঁপে/ পেয়ারা/লেবু গাছের নিচে আনারস সফলভাবে ফলানো সম্ভব হয়েছে। এ ধরনের ৩ স্তর বিশিষ্ট ফসল চাষে আর্থিক লাভও কম নয়। চার বছর গবেষণার পর দেখা গেছে যে, প্রতি বছর হেক্টরপ্রতি শুধু আম থেকে ১,২০,০০০/- টাকার মতো আয় হয় কিন্তু বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল বিন্যাস (আম, আনারস ও পেঁপে) থেকে আমের অনুৎপাদন মৌসুমে ১,৬০,০০০/- এবং উৎপাদন মৌসুমে ২,২০,০০০/- টাকার মতো লাভ পাওয়া যায়। পিএইচ.ডি গবেষক জনাব সফিকুল বারী তাঁর তিন বছরের গবেষণা কার্যক্রম থেকে দেখেছেন যে, আম বাগানের নিচে ২য় স্তরে পেয়ারা এবং নিম্ন স্তরে ওষুধি গুল্ম অ্যালোভেরা, অ্যাসপ্যারাগাস ও মিসরিদানা সফলভাবে উৎপাদন করা যায়। উল্লেখ্য, এই ওষুধি গুল্মগুলো বর্তমানে বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে ফসলের জমিতে এককভাবে চাষ করা হচ্ছে, যা আমাদের খাদ্য শস্য উৎপাদনের জন্য মূল্যবান জমিকে আরো কমিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং ওষুধি উদ্ভিদকে অবশ্যই বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের আওতায় চাষ করা একান্ত প্রয়োজন।



বাংলাদেশের জন্য ধারণকৃত বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের কাঠামো

ভূমি সংলগ্ন লতাপাতা সমৃদ্ধ নিম্নস্তর, বৃক্ষ সমৃদ্ধ উচ্চ স্তর এবং এ দু’য়ের মধ্যবর্তী স্তর নিয়েই বসতবাড়ি বহুস্তর বাগান। নিম্নস্তরটিকে দু’টি ভাগে ভাগ করে ১ মি. এর কম উচ্চতা বিশিষ্ট সর্ব নিম্নস্তরে শাকসবজি ও ওষুধি গাছ এবং ১-৩ মি. উচ্চতায় কলা, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, শিমুল আলু, রাঙ্গা আলু ইত্যাদি চাষ করা যেতে পারে। উপরের স্তরটিও দু’টি ভাগে ভাগ করে ২৫ মি. বেশি উচ্চতায় সু-উচ্চ কাষ্ঠল ও ফলদ বৃক্ষ এবং ১০-১২মি. উচ্চতায় মাঝারি উচ্চতার ফলদ এবং কাষ্ঠল উদ্ভিদ লাগানো যেতে পারে।



বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের জন্য উদ্ভিদ/ফসল নির্বাচন

বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের উদ্ভিদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতিলক্ষ্য রাখতে হবে।



ক. বাগানে গাছ লাগানোর জন্য ছায়া পছন্দকারী বা ছায়াসহ্যকারী উদ্ভিদ/ফসল চিহ্নিত করতে হবে।

নির্বাচিত বিভিন্ন ফসল/উদ্ভিদের সমন্বয় এমন হতে হবে যেন ফসল উৎপাদন চক্র এবং মাত্রা সারা বছর নিয়মিত উৎপাদন বজায় রাখতে পারে।



খ. আবহাওয়া ও জলবায়ুগত কারণে বছরের কিছু সময় ফসল সংগ্রহের পরিমাণ কম বা বেশি হতে পারে কিন্তু প্রাত্যহিক কিছু না কিছু উৎপাদন যেন থাকে। অর্থাৎ বছরের প্রায় সবসময়ই যেন ফলন এবং উপজাত হিসেবে জ্বালানি ও অন্যান্য উপকরণ পাওয়া যায়।



গ. বাগানে উৎপাদিত সামগ্রী কৃষকের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে এবং অতিরিক্ত আয়, অন্যান্য কৃষি ফসলহানিতে ও দু’ফসলের মধ্যবর্তী সময়ে কৃষককে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবে।



ঘ. পারিবারিক সদস্যদের ন্যূনতম শ্রমের মাধ্যমেই বাগানে ফসল পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহ সম্পন্ন হয় এমন হতে হবে।



বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা

সর্বাধিক ফল ও বায়োমাস পেতে বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের ফসল ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে গাছ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছ/ফসল লাগানো থেকে সর্বশেষ ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত সঠিক উদ্যানতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচর্যা পদ্ধতি অবলম্বন করলে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং উদ্ভিদ ও এর সহযোগিদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ফলন নিশ্চিত হয়। পর্যাপ্ত এবং উপযুক্ত প্রুনিং ও ট্রেনিং এর মাধ্যমে একক জমিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক গাছ সফলভাবে জন্মানো সম্ভব। গাছের সঠিক ব্যবস্থাপনার সাথে সাথে প্রুনিং করলে প্রতিটি গাছ থেকে এর বিভিন্ন উপজাত সহ সর্বোচ্চ ফলন আশা করা যায়। ফলদ, বনজ ও কৃষি ফসল মধ্যকার সু-সংঘবদ্ধতার ওপরই গাছের নিচে বা পার্শ্বে জন্মানো ফসলের সর্বাধিক ফলন নির্ভর করে। নিম্নস্তরের কৃষি ফসলের সঠিক পরিচর্যা করলে তা দ্বারা মধ্যম ও উপরের স্তরের বৃক্ষ উপকার পাবে। তাই বহুস্তর বাগানে ফসলের আন্তঃপরিচর্যা অত্যন্ত যত্নের সাথে করতে হবে। বাগানকে কখনই অপরিষ্কার-জলাবদ্ধ রাখা যাবে না। বর্ষাকালে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিতে হবে।



ফল, জ্বালানি, আসবাব তৈরির কাঠ ও বহুবিধ কৃষি সামগ্রী পাওয়ার সাথে সাথে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য বসতবাড়িতে এবং ফলের বাগানে বহুস্তর বিশিষ্ট ফসল চাষ পদ্ধতি অবলম্বন করা অপরিহার্য। উদ্ভাবিত মডেল বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আম, পেয়ারা, সুপারি এবং লিচু বাগান; পূর্বাঞ্চলের কাঁঠাল বাগান এবং বাংলাদেশের বনাঞ্চলের জন্য উপযোগী। এ মডেলটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গ্রাম ও খামার বনায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সমপ্রসারিত হয়েছে। তবে বর্তমানে প্রায় সারা দেশেই এ মডেলটি সমপ্রসারণের উপযোগিতা লাভ করেছে। বর্তমানে সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি) এর অর্থায়নে ইন্টার কো-অপারেশন-এগ্রোফরেস্ট্রি ইমপ্রুভমেন্ট পার্টনারশিপ (এএফআইপি) এর তত্ত্বাবধানে সারা দেশে এ প্রযুক্তিটি সমপ্রসারণের কাজ চলছে। এছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে বন্যামুক্ত জমিতে নতুন বাগান সৃজনের ক্ষেত্রে বহুস্তর বিশিষ্ট বাগানের মডেল অনুসরণ করলে তা ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে সমগ্র দেশের জন্য প্রভূত কল্যাণ বয়ে আনবে। দেশের দুর্যোগপূর্ণ এলাকা বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় দারিদ্র্য বিমোচন এবং মংগা এলাকায় পুষ্টি ও খাদ্য যোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



লেখক : উদ্যানতত্ত্ব বিভাগ,
বাকৃবি, ময়মনসিংহ

তথ্যসূত্র: ফার্মহাউস

হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের বীজ সম্পদ

গাছের যে অংশ বংশ বিস্তারের জন্য ব্যবহৃত হয় অর্থাৎ যা দিয়ে পরবর্তী বছরে চাষাবাদের মধ্যদিয়ে ফসল উৎপাদন করা হয় এবং ভবিষ্যত উৎপাদনের জন্য সংরন করা হয় সাধারন অর্থে তাকেই বীজ বলা হয়। আমাদের কৃষি নির্ভর সভ্যতার মূল ভিত্তিই হলো বীজ। কৃষি কাজের জন্য বীজ সবচাইতে গুরুত্বপূর্ন এবং অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ।

বীজ উৎপাদনে কৃষকদের ভূমিকা, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যঃ

যুগ যুগ ধরে আমাদের দেশের কৃষকগন তাদের প্রয়োজনীয় বীজ নিজেরাই উৎপাদন করতেন এবং পারষ্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে তারা প্রয়োজন মেটাতেন। একটি এলাকার ভাল গুনাগুন সম্পন্ন ফসলের জাতের বীজ অন্য এলাকার কৃষকগন এরূপ বিনিময়ের মাধ্যমেই সংগ্রহ করতেন। বাছাই ও নির্বাচনের মাধ্যমে কৃষকগন ভাল জাতের বীজ সংরন করতেন এবং খারাপ জাতের বীজ নিজেরাই বাদ দিয়ে দিতেন। এভাবে পুরো বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়াতে কৃষকগন ছিলেন স্বয়ংসম্পুর্ন এবং বীজের উপর তাদের নিরঙ্কুশ অধিকার ও নিয়ন্ত্রন ছিল। বীজের জন্য কৃষকের বাজারের উপর নির্ভরশীলতা ছিলনা বললেই চলে। তা ছাড়া গ্রাম বাংলার কৃষকগন তাদের উদ্ভাবনী শক্তি ও লোকজ জ্ঞান ব্যবহার করে স্থানীয় প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী বীজ নির্বাচন করত। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্যেই লুকায়িত ছিল বন্যা, খরা, লবনাক্ততা, জলোচ্ছাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার কৌশল। এভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার পাশাপাশি এই প্রক্রিয়ায় যুগ যুগ ধরে টিকে ছিল প্রান বৈচিত্র্যের সমাহার, টিকে ছিল একেক ফসলের শত শত রকমের জাত। বাংলাদেশ প্রানবৈচিত্র্যের দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম দেশ হওয়ার চাবিকাঠিও ছিল বীজ উৎপাদন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কৃষকদের নিয়ন্ত্রন।

উফশী এবং হাইব্রীড বীজের প্রবর্তন এবং আমাদের জেনেটিক রিসোর্সঃ

ষাটের দশকে তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে উচ্চ ফলন শীল (উফশী) জাতের বীজের প্রবর্তনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় বীজের উপর কৃষকের অধিকার ও নিয়ন্ত্রন হারানোর প্রক্রিয়া। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে বাংলাদেশে হাইব্রিড বীজের প্রবর্তন এ প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করে। হারিয়ে যেতে থাকে আমাদের অমূল্য সম্পদ হাজার রকমের দেশীয় ফসলের জাত। ১৯৭৪ সালের এক সমীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশে ৭৪৩৯ টি ধানের জাত সনাক্ত করা হয়েছে। (সূত্রঃ বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশ)। বর্তমানে অধিকাংশ জাতই হারিয়ে গেছে, অনেকের মতে বর্তমানে তা ২০০ টির নীচে এসে দাঁড়িয়েছে। দেশীয় শাকসব্জী সমূহের অধিকাংশ জাত হারিয়ে গেছে বা প্রায় বিলুপ্তির পথে। তার জায়গা দখল করে নিয়েছে উফশী বা হাইব্রীড জাত যার উৎপাদন এবং বাজারজাতকরণের নিয়ন্ত্রন করছে বহুজাতিক কোম্পানী সহ দেশী বিদেশী বড় বড় কোম্পানী সমূহ। এর ফলে আমাদের দেশের কৃষকগণ বীজের উপর অধিকার এবং নিয়ন্ত্রন ক্রমশই হারিয়ে ফেলছে।

পরিপ্রেক্ষিত, নোয়াখালীঃ

বিস্তীর্ন চরাঞ্চলের সমন্বয়ে গঠিত নোয়াখালী অঞ্চলের শতকরা আশিভাগেরও বেশী লোকের জীবিকার প্রধান বা একমাত্র অবলম্বন হলো কৃষি। কিন্তু বীজ সহ সকল কৃষি উপকরণ এর উপর কৃষকগণের কোন নিয়ন্ত্রন না থাকায় এবং উচ্চমূল্যের কারণে তারা আর্থিকভাবে তিগ্রস্থ হচ্ছে। ইতোমধ্যে এ এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে অনেক প্রজাতির ধান সহ নানান শাকসব্জীর বীজ। ফুলমতি, লাঠিয়াল, চুয়াই, ভুঁষিহারা, কটকতারা, মইলাম, মতিহরি, আগুনিশাইল, লোহামুরা, বাঁশমতি, ফুলবাদাম ইত্যাদি অনেক জাতের ধানের নাম অনেক প্রবীন কৃষকের মুখে শোনা গেলে ও এগুলো এখন আর এ অঞ্চলে পাওয়া যায় না। হারিয়ে যেতে বসেছে ষাইটা, ঘিগজ, শাক্করখোরা, কালিজিরা, কালা মোডা, ধলা মোডা, বাজাল ইত্যাদি অনেক জাতের ধান। ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে কালো রঙের দেশী তরমুজ, দেশীয় জাতের মূলা, টমাটো সহ অনেক সব্জীর জাত। বন্ধ হয়ে গেছে কাউন, তিল, তিসি, মুগ ইত্যাদি জাতের ফসল আবাদ। হারিয়ে যাওয়া এসকল ফসলের জাত সমূহের ছিল বন্যা খরা রোগ ইত্যাদি প্রতিরোধের প্রাকৃতিক মতা। জীব বৈচিত্র্য বজায় রাখা, ভূমির উর্বরতা বজায় রাখার জন্য এসকল জাতের ভুমিকা ছিল অপরিসীম। অথচ আধুনিক কৃষির ডামাডোলে, মুনাফালোভী বহুজাতিক কোম্পানী কর্তৃক উফশী এবং হাইব্রীড জাতের বীজের ব্যবসার কারণে আমরা আমাদের অতি মূল্যবান জেনেটিক সম্পদ সমূহ হারিয়ে যেতে বসেছে। অতি মূল্যবান এ সকল জেনেটিক সম্পদ রার জন্য এক্ষুনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে অবশিষ্ট সম্পদ সমূহও অচিরেই হারিয়ে যাবে এবং জাতির জন্য যে অপূরনীয় তি হবে তা আর কখনো পুনরুদ্ধার করার উপায় থাকবেনা। অথচ সরকারিভাবে এ সকল জেনেটিক রিসোর্স সমূহ রা করার জন্য কোন উদ্যোগ এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি। উপযুক্ত গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করে স্থানীয় জেনেটিক রিসোর্সসমূহ সংরক্ষণের এবং এগুলো ব্যবহার করে আমাদের জল হাওয়ার উপযোগী জাত উদ্ভাবনে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীগণের জন্য সুযোগ তৈরী করে দিলে একদিকে যেমন জেনেটিক সম্পদসমূহ রক্ষা পেত অপরদিকে বেচে যেত বীজ আমদানীর জন্য কোটি কোটি টাকা। অথচ আমরা তা না করে বহুজাতিক কোম্পানী সমূহের জন্য বীজ ব্যবসার সুযোগ তৈরী করে দিচ্ছি। ফলে জেনেটিক রিসোর্স হারানোর পাশাপাশি আমাদের কৃষক এমনকি পুরো কৃষি ব্যবস্থাকেই বহুজাতিক কোম্পানী সমূহের কাছে জিম্মি করে ফেলেছি।

এ অবস্থার হাতে থেকে পরিত্রান পাওয়ার জন্য যেমন প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ, তেমনি প্রয়োজন আমাদের জনসচেতনতা। আমরা গ্রাম পর্যায়ে কৃষকগণকে সংগঠিত করে গ্রাম পর্যায়ে ছোট ছোট বীজ ভান্ডার গড়ে তুলতে পারি। সেখানে কৃষকগণ দেশীয় কিন্তু কার্যকরী পদ্ধতি ব্যবহার করে বীজ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করবে এবং নিজেদের প্রয়োজন মত তা ব্যবহার করতে পারবে। এতে করে স্থানীয় জেনেটিক রিসোর্স সমুহকে হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রা পাবে। স্থানীয় কৃষকগণ নিজেদের বীজ নিজেরা উৎপাদনে উৎসাহিত হবে এবং বাজারের উপর নির্ভরশীলতা কমবে। সর্বোপরি বীজ সম্পদের উপর কৃষকগণের অধিকার নিশ্চিত হবে।

  • সহকর্মী কৃষিবিদ তপন চক্রবর্ত্তীর লেখা। লেখকের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত।
তথ্যসূত্র: মুকুলবিডি

কৃষি

কৃষি বিষয়ক যাবতীয় তথ্যাবলী