লিটার পদ্ধতিতে মুরগি পালন এবং প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়

লিটার পদ্ধতিতে মুরগি পালন এবং প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয়
কৃষিবিদ মো. মহির উদ্দিন

আবহমান কাল থেকে গ্রাম বাংলার মানুষেরা ঘরের কোণে খানিক জায়গা করে অথবা খোয়াড় বা কুঠি তৈরি করে মুরগি পালন করে আসছে। এ ক্ষেত্রে গৃহকর্মের পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদেই সাধারণত গ্রামের মানুষেরা এভাবে মুরগি পালন করে থাকেন। কিন্তু মুরগি পালন এখন পেশা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই এখন সনাতন ধারার পদ্ধতির পরিবর্তে বৃহত্তর পরিসরে বাণিজ্যিকভাবে আধুনিক পদ্ধতিতে মুরগি পালন করা হচ্ছে। আমাদের দেশে বাণিজ্যিকভাবে মুরগি পালনের বহুল প্রচলিত তিনটি পদ্ধতি হচ্ছে-

১. লিটার পদ্ধতি

২. খাঁচা পদ্ধতি

৩. মাচা পদ্ধতি

লিটার পদ্ধতি

লিটার অর্থ মুরগির বিছানা। মুরগি যে ঘরে লালন পালন করা হবে সে ঘরের ভেতরে মুরগির জন্য আরামদায়ক, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তথা উৎপাদন সহায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য মেঝেতে ধানের তুষ, কাঠের গুঁড়া ইত্যাদি বিছানো হয়। বাংলাদেশে ছোট এবং মাঝারি আকারের অধিকাংশ খামারেই ফ্লোর/লিটার পদ্ধতিতে মুরগি পালন করা হয়ে থাকে।

লিটার ব্যবহারের উদ্দেশ্য

ক. ফ্লোরে মুরগি পালনের ক্ষেত্রে লিটার ব্যবহার অনিবার্য। লিটার ব্যবহারের উদ্দেশ্য ঘরে মুরগির জন্য স্বাস্থ্যপ্রদ আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা দেশে দৃশ্যমান এ তিন সময়েই লিটার মুরগির জন্য আরামদায়ক অবস্থা রচনা করে।

খ. মুরগি যে পায়খানা করে তার জলীয় অংশ শোষণ করে ঘরকে রাখে শুকনা ও দুর্গন্ধমুক্ত।

গ. লিটার ব্যবহারের কারণে মুরগির পায়খানা মেঝেতে লেপ্টে যেতে পারে না।

ঘ. শীতকালে বাচ্চার ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।

লিটার সামগ্রী যেমন হবে

ক. যে বস্তু বা দ্রব্যাদি লিটার হিসেবে ব্যবহৃত হবে, তা হবে বহুল প্রচলিত নরম ও আরামদায়ক

খ. দ্রুত পানি ও আর্দ্রতা শোষণ ক্ষমতাসম্পন্ন

গ. সহজলভ্য

ঘ. দামে সাশ্রয়ী

ঙ. ব্যবহৃত লিটার সামগ্রী সার হিসেবে ব্যবহৃত হবে অর্থাৎ এর আর্থিক মূল্য থাকবে

চ. কম তাপ পরিবাহী হবে অর্থাৎ পরিবেশের তাপমাত্রায় বেশি উত্তপ্ত হবে না

ছ. আবহাওয়ার আর্দ্রতা কম শোষণ করার ক্ষমতা থাকবে অর্থাৎ খারাপ আবহাওয়ায় লিটার ড্যাম হবে না।

লিটার হিসেবে ব্যবহার্য দ্রব্য সামগ্রী

লিটার হিসেবে অনেক কিছু ব্যবহার করা যেতে পারে, আমাদের দেশে মাত্র দুটি বস্তু লিটার হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়-

১. ধানের তুষ

২. কাঠের গুঁড়া

এছাড়া আরো যে বস্তু লিটার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে তা হচ্ছে-

বালি, কাগজ, ভুট্টার মোচা চূর্ণ, গম বা ধানের খড়, শুকনা ঘাস, পাতা, চীনাবাদামের খোসা ।

যে ভাবে লিটার সামগ্রী সাজাবেন

মুরগির অনেকগুলো ¯^vfvweK আচরণের মধ্যে একটি হচ্ছে পা দিয়ে মাটি, ময়লা, খাদ্য আবর্জনা আঁচড়ানো। যে পদ্ধতিতেই মুরগি পালন করা হোক না কেন, এটা পরিলক্ষিত হবে। তাই মুরগির ঘরে লিটার বিছানোর সময় এ বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। মেঝের আয়তন অনুসারে লিটারের গভীরতা/ পুরুত্ব যদি কম হয়, তাহলে সহজেই পা দিয়ে সরিয়ে মেঝে বের করে পায়খানা করে ঘরকে অস্বাস্থ্যকর করে তুলবে। বয়স অনুসারে ঘরে লিটারের গভীরতা হবে- বাচ্চার ক্ষেত্রে ২-৩ ইঞ্চি, পুলেট বা লেয়ারের ক্ষেত্রে ৪-৬ ইঞ্চি।

লিটার ব্যবস্থাপনা

লিটার ব্যবহারের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সুষ্ঠু লিটার ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। লিটার সামগ্রী শুকনা মেঝেতে বিছাতে হবে। লিটার সামগ্রী বিছানোর পর কোন আবর্জনা, শক্ত পদার্থ থাকলে তা বেছে ফেলতে হবে। ক্রয়ের সময় লিটার সামগ্রী ভেজা থাকলে, বিশেষ করে কাঠের গুঁড়া রৌদ্রে শুকিয়ে তারপর বিছাতে হবে। লিটার সামগ্রী ঘরে বিছানোর সময় আর্দ্রতা থাকবে ২০%; ব্যবহারের মাঝামাঝি ২০-২৫% এবং ব্যবহারের শেষে ৩০%। লিটারের আর্দ্রতা ২০% এর কম হলে অর্থাৎ লিটার খুব শুষ্ক হলে মুরগির দেহের জলীয় অংশ শুষে নেয় ফলে ডি-হাইড্রেশন হয়। লিটার খুব শুষ্ক হলে ঘর ধুলিময় হয়, এর ফলে ব্যবহৃত পানিতে ময়লা জমে। এ অবস্থায় পানি হালকাভাবে সেপ্র করে লিটারের আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় রাখতে হবে। আর্দ্রতা খুব বেশি হলে লিটার মুরগির পায়খানার জলীয় অংশ শোষণ করতে পারে না, বিধায় ঘরে লিটার ভেজা ভেজা হয় এবং দুগর্ন্ধ তৈরি হয়। কোন কারণে আর্দ্রতা বেশি হলে, কিছু শুকনা লিটার মিশিয়ে আর্দ্রতা কমানো যায়। তাছাড়া ঘরে বায়ু প্রবাহ চালানোর মাধ্যমে আর্দ্রতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আনয়ন করা সম্ভব। লিটারের উপর মুরগির পায়খানা জমলে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে এবং গন্ধ তৈরি হলে ওলট পালট করে দিতে হবে। অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই যেন দুর্গন্ধ তৈরি না হয়। ব্যবহারের সময় পানি পড়ে বা অন্য কোন ভাবে ভিজে গেলে ভেজা অংশ তুলে নতুন লিটার সামগ্রী মেশাতে হবে। যখন দরকার মনে হবে, অর্থাৎ অস্বাভাবিক অবস্থা তৈরি হলে ওলট পালট করে দিতে হবে, কোন অবস্থাতেই লিটার জমাট বাঁধতে দেয়া যাবে না। ডিমপাড়া অবস্থায় দিনের যে সময় সাধারণত ডিম দেয় না সে সময় লিটার উল্টিয়ে দিতে হবে, কারণ ডিম পাড়া অবস্থায় মুরগী বিরক্ত বোধ করলে উৎপাদন কমে যাবে।

লিটার পরিবর্তন ও পরিশোধন

লেয়ার বা ব্রয়লার যাই হোক প্রতি ব্যাচ মুরগি পালনের পর লিটার সামগ্রী পরিবর্তন/ফেলে দেয়া উচিত। বাচ্চা ব্রুডিং এ অবশ্যই নতুন লিটার ব্যবহার করতে হবে। নতুন বাচ্চার ক্ষেত্রে কোন অবস্থাতেই পুরাতন লিটার ব্যবহার করা যাবে না। পুরাতন লিটার ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। লিটার বিশুদ্ধকরণের জন্য প্রতি ১৫ বর্গফুট জায়গায় আধাকেজি হিসেবে সুপার ফসফেট মেশাতে হবে। পুরাতন লিটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে চুন বা সুপার ফসফেট মেশাতে হবে তারপর এক জায়গায় স্তূপ করে রাখতে হবে। এর ফলে লিটারের ভেতরে তাপ উৎপন্ন হয়ে রোগের জীবাণু মারা যাবে।

লিটার পরীক্ষা

লিটার পরীক্ষা বলতে লিটারে বিদ্যমান আর্দ্রতা পরিমাপকে বুঝায়। লিটারের আর্দ্রতা পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরী টেস্টের দরকার নেই। অভিজ্ঞতার আলোকেই সুচারুভাবে লিটার পরীক্ষা করা যায়। আমরা জানি ব্যবহৃত লিটারে আর্দ্রতা হবে ২০-৩০%। প্রথমে ১ মুঠো লিটার মুঠের ভেতর চাপ দিলে তিনটি অবস্থার একটি পরিলক্ষিত হবে।

ক. চাপ দেয়ার পর মুঠ খুললে যদি লিটার জমাট না বাঁধে বা ঝরে না যায় তাহলে বুঝতে হবে লিটারের আর্দ্রতা ২০-৩০% এর মধ্যে আছে।

খ. যদি ঝরে পড়ে তাহলে বুঝতে হবে লিটারের আর্দ্রতা ২০%এর নিচে।

গ. যদি জমাট বাঁধে তাহলে বুঝতে হবে আর্দ্রতা ৩০% এর উপরে ।

লিটার ব্যবহারের সময় লিটারের আর্দ্রতা পরীক্ষা ছাড়াও লিটারের অবস্থা পরীক্ষা করতে হবে। যেমন লিটার সামগ্রীর স্বাভাবিক রঙ অর্থাৎ যে দ্রব্য সামগ্রী লিটার হিসেবে ব্যবহার করা হবে, তা যদি পচা বা তার স্বাভাবিক রঙ নষ্ট থাকে তাহলে তা ব্যবহার করা ঠিক হবে না।

মাংস ও ডিম উৎপাদনে লিটারের প্রভাব

লিটার পদ্ধতিতে মুরগি পালনের ক্ষেত্রে লিটারের আর্দ্রতাজনিত উল্লেখিত তিন অবস্থা মুরগির সুস্থতা, দৈহিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনে প্রভাব বিস্তার করে।

ক. স্বাভাবিক লিটার (আর্দ্রতা ২০-৩০%)

খ. শেড/মুরগির ঘর শুষ্ক ও দুর্গন্ধমুক্ত থাকবে

গ. মুরগি স্বস্তিতে থাকবে

ঘ. খাদ্য রূপান্তর হার বেশি হবে

ঙ. লিটারে উৎপাদিত খাদ্য কণা ভালোভাবে গ্রহণ করবে

চ. মুরগির স্বাভাবিক উৎপাদন, বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে।

লিটার শুষ্ক হলে

ক. লিটারের আর্দ্রতা খুব কম হবে মুরগির শরীরের জলীয় অংশ শোষণ করে পানিশূন্যতা তৈরি করে।

খ. মুরগি অস্বস্তিতে থাকবে

গ. ক্যানাবলিজম (ঠোকরানো আচরণ) হবে

ঘ. পানি পান করার প্রবণতা বেশি হবে অর্থাৎ পানি বেশি পান করবে, ফলে খাদ্য কম খাওয়ার কারণে শরীরে পুষ্টি ঘাটতি হতে পারে।

ঙ. ঘর ধুলিময় হবে।

লিটারের আর্দ্রতা বেশি হলে

ক. ঘরে গ্যাস তৈরি হবে

খ. ককসিডিওসিস কৃমির প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে

গ. ফুট প্যাড লিসন (Foot Pad lesion) হবে

ঘ. বাচ্চার পালক গজানোর হার কম হবে ফলে দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হবে

ঙ. আর্দ্রতা বেশি হলে ইনটেস্টাইনাল (Intestinal) ট্রাক থেকে পানি শোষণ কমে যায় এর ফলে পায়খানায় পানির পরিমাণ বেড়ে যাবে।

লেখক : ব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত)
সরকারি হাঁস-মুরগি খামার, রাজবাড়ি

No comments: